ঝরিয়া: একশ বছরেও যে আগুন নেভেনি
বাড়িতে আগুন লাগা, কোনো এলাকায় আগুন লাগা বা জঙ্গলে আগুন লাগার ঘাটনা আমরা মাঝে মাঝেই শুনি। সে আগুন কিছু সময় বা কয়েকদিন পরে নিভেও যায়। কিন্তু এমন যদি শোনা যায় যে আগুন জ্বলছে পুরো একটা শহর জুড়ে? তাও আবার একশ বছর ধরে? বিশ্বাস করতে মন সায় দেয় না। তাই না? অবিশ্বাস্য হলেও এমনই এক ঘটনা ঘটেছে আমাদের দেশে।
ভারতে ঝাড়খন্ড রাজ্যে ধানবাদ জেলার দক্ষিণ-পশ্চিম-এ আছে একটি ছোট্ট শহর (township), নাম ‘ঝরিয়া’। এর মাটির তলায় রয়েছে এক বিশাল কয়লার ভান্ডার। ১৮৯৪ সালে এই কয়লা খনি থেকে কয়লা উত্তোলোনের পরিকল্পনা করা হয়। প্রথম দিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শুধু ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদেরই কয়লা তোলার অনুমতি দিত। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ কয়লা তোলার জন্য পর্যাপ্ত পরিকাঠামো তাদের হাতে ছিল না। তাই কয়েক বছর পরেই তারা ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ভারতীয় ব্যবসায়ীদেরও কয়লা তোলার অনুমতি দিতে শুরু করে। ফলে গুজরাত, কছ প্রভৃতি এলাকা থেকে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এখানে আসতে শুরু করে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞে সামিল শ্রমিকেরা এখানেই স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে। দেখতে দেখতে একদা অখ্যাত গ্রাম ঝরিয়া পরিণত হয় এক ছোটখাট শিল্প নগরীতে।
কয়লা উত্তোলনের আগে ও পরে যে সব সাবধানতা নেওয়া দরকার সেসব নেওয়া সত্বেও খনিতে একদিন আগুন লেগে যায়। প্রায় একশ বছর আগে মাটির নীচের এই বিশাল কয়লা ভান্ডারে কীভাবে এবং কবে আগুন লেগেছিল তা আজও জানা সম্ভব হয় নি। তবে অধিকাংশ মানুষেরই বিশ্বাস, ঘটনাটা ঘটেছিল ১৯১৬ সালের কোনো এক সময়। সম্ভবত, ঝরিয়ার ভউরা এলাকার একদল শ্রমিক কাজের শেষে খনিমুখের কাছাকাছি কোনো এক জায়গায় আগুন জ্বেলে নেশার পানীয় তৈরি করছিল। স্থানীয় ভাষায় এই পানীয়কে বলা হয় ‘হুচ’ (hooch)। সাধারণত ‘মওরা’ (Mowra, bassia latifolia) গাছের ফুল জলে ফুটিয়ে এই পানীয় তৈরি করা হয়। এটা খনি অঞ্চলে একটা সাভাবিক ঘটনা। অনেকে মনে করেন এই পানীয় তৈরি করার সময়েই কোনোভাবে খনিতে আগুন লেগে যায়। মওরা গাছের ফুল জলে ফোটানোর সময় মিথেন গ্যাস তৈরি হয়। কোনো কারণে সেদিন এই গ্যাসের পরিমাণ বেশি ছিল।
বিজ্ঞানীদের অনুমান এই গ্যাস বাতাসের সঙ্গে মিশে খনি গর্ভে ঢুকে পড়ে এবং বিস্ফোরণ ঘটায়। আর তা থেকেই ‘বহুরা’ কয়লা খনিতে আগুন ধরে যায়। প্রথম দিকে ভাবা হয়েছিল আগুন সহজেই নেভানো যাবে। ভুল ভাঙল যখন দেখা গেল কমার পরিবির্তে দিনে দিনে আগুন ছড়িয়ে পড়ছে। প্রথম দিকে আগুন বহুরা এলাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু আশেপাশের এলাকার খনিগুলি থেকে কয়লা যত উত্তোলিত হতে থাকে খনিগর্ভে বায়ু তত বেশি বেশি করে প্রবেশ করতে থাকে। সেই সঙ্গে খনির ভিতরে অক্সিজেনের পরিমাণও তত বাড়তে থাকে। ফলে অন্যান্য এলাকাতেও আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
Image source: Your Story
বহুরা কয়লা খনিতে আগুন লেগেছিল ১৯১৬ সালে। প্রথম দিকে ভাবা হয়েছিল যে আগুন নিজে নিজেই নিভে যাবে। কোম্পানীগুলির হাতে থাকা প্রযুক্তি এবং স্থানীয় মানুষদের সাহায্যে হয়তো আগুন নেভানোর চেষ্টাও হয়েছিল। কিন্ত আগুন নেভেনি। যখন বোঝা গেল পরিস্থিতি আয়ত্বের বাইরে চলে গেছে ততদিনে ছ’-ছটা বছর কেতে গেছে। তাই বলা যায়, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আগুন নেভানোর প্রথম চেষ্টা করা হয় ১৯২৪ সালে। ততদিনে অবশ্য প্রচুর কয়লা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ব্রিটেন থেকে নিয়ে আসা হয় ভূ-তত্ববিদদের। সমগ্র এলাকা ঘুরে দেখে তাঁরা মত দিয়েছিলেন, খনিগর্ভে কোনোমতেই যেন অক্সিজেন ঢুকতে না পারে। সেইমত খনিগর্ভের মুখ এবং ফাঁক-ফোকরগুলি বালি দিয়ে ভালোভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। অক্সিজেনের অভাবে আগুন নিভে যাওয়ার কথা। কিন্তু নিভল না। বরং, খনির ভিতরের অত্যাধিক তাপে মাটির উপরে বড় বড় ফাটল দেখা দিল। সেখান থেকে খনিগর্ভে উৎপন্ন তাপ বাইরে বেরিয়ে আসতে লাগল আর উপর থেকে বায়ুর সঙ্গে অক্সিজেন হু হু করে ভিতরে ঢুকতে লাগল। ফলে আগুন নেভা তো দূরের কথা উল্টে নতুন নতুন এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়তে থাকে। প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে দেখে বিশেষজ্ঞরা আরও নানা ভাবে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় নি। প্রায় আট বর্গ কিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে থাকা চার কোটি মেট্রিক টন কয়লা ধিকি ধিকি করে জ্বলে ছাই হতে থাকে।
ইতিমধে চার কোটি তিরিশ লক্ষ মেট্রিক টন কয়লা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এক মেট্রিক টন কয়লার বর্তমান বাজার দর ১৪০০০ টাকা (প্রায় ২৫০ ডলার) ধরলে সহজেই বোঝা যায় যে আর্থিক লোকসান কতটা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে এই লোকসান আরও বাড়বে। কারণ ঝরিয়া কয়লা খনির আগুন এখনও জ্বলছে।
ঝরিয়ার পরিবেশ এখন বিপজ্জনক। তপ্ত মাটিতে পা রাখা যায় না। মাঝে মাঝেই মাটি ফেটে বেরিয়ে আসছে কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ইত্যাদির মত বিষাক্ত গ্যাস। মাঝেমাঝে ফাটলগুলি থেকে আগুনের হলকা বেরিয়ে আসছে। যেকোনো সময় মাটি ধসে যেতে পারে। যেকোনো সময়ে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সবকিছু মিলিয়ে এই অঞ্চলে এখন আর বসবাস করার মত কোনো পরিবেশই নেই। একসময় এখানে চার লক্ষের মত লোকের বাস ছিল। ঝাড়খন্ড সরকার ইতিমধ্যেই এখান থেকে অধিকাংশ লোককেই সরিয়ে নিয়ে গেছেন। নতুন বাসস্থান করে দেওয়া হয়েছ দশ কিলোমিটার দূরে ‘বেলঘরিয়া’ শহরতলিতে’। ঝরিয়াতে এখনও প্রায় ৮৭ হাজারের মত লোক রয়ে গেছে। খুব শীঘ্রই এদেরও সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।
কয়লা খনিতে আগুন লাগে কীভাবে এবং তা নেভানো প্রায় অসম্ভব কেন- এসবের উত্তর পেতে হলে আমাদের জানতে হবে মাটির নীচে কয়লার স্তর কীভাবে থাকে এবং তা তোলা হয় কীভাবে। মাটির নীচে থাকা কয়লার স্তরকে বলা হয় ‘সিম’(seam)। এগুলি মাটির নীচে পাথর, বালি, নুড়ি, চুনা পাথর ইত্যাদি দিয়ে ঢাকা অবস্থায় বিভিন্ন স্তরে থাকে। কয়লা তোলার জন্য সাধারণত দুটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়ে থাকে- ১) আন্ডারগ্রাউন্ড মাইন পদ্ধতি (Underground mine ) এবং ২) ওপেন কাস্ট মাইন পদ্ধতি (Open cast maine )। কোথায় কোন পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে তা নির্ভর করে সিম-এর উপরের আস্তরণ কেমন তার উপর। যদি আস্তরণে শক্ত পাথর থাকে(যা সরানো সম্ভব নয়) তাহলে প্রথম পদ্ধতি, আর যদি আস্তরণ নরম হয় তাহলে দ্বিতীয় পদ্ধতি।
আন্ডারগ্রাউন্ড মাইন পদ্ধতিঃ এই পদ্ধতিতে প্রথমে মাটির উপর থেকে সিম পর্যন্ত দুটো খাড়া এবং সমান্তরাল সূড়ঙ্গ কাটা হয়। এরপর এই সূড়ঙ্গ পথে দুটো ফাঁপা নল বসিয়ে দেওয়া হয়(অনেকটা একটু তফাতে থাকা দুটো কুঁয়োর মত)। দুটোর একটিতে থাকে লিফট-এর মত একটা যন্ত্র যার সাহায্যে নীচ থেকে কয়লা উপরে তুলে আনা হয়। শ্রমিকরাও এই লিফটের সাহায্যে খনিতে ওঠানামা করে। অপর সূড়ঙ্গ পথটি ব্যবহার করা হয় বায়ু চলাচলের জন্য। উপর থেকে পাম্প করে এই পথে খনির ভিতরে বাতাস পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপর মাটির নীচে যে সিম অর্থাৎ, কয়লার স্তর থাকে তা তুলে আনার জন্য ঐ সিম বরাবর একটি আনুভুমিক সূড়ঙ্গ কাটা হয়। শ্রমিকেরা এই সূড়ঙ্গ পথ ধরে কয়লা কেটে সেই কয়লা লিফটের সাহায্যে খাড়া সূড়ঙ্গ পথ দিয়ে উপরে পাঠিয়ে দেয়।
ওপেন কাস্ট মাইন পদ্ধতিঃ
আগেই বলেছি, সিম-এর উপরের স্তরগুলি নরম হলে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে কোনো সূড়ঙ্গ কাটা হয় না। মাটি এবং সিম-এর উপরের অন্যান্য স্তরগুলি যন্ত্রের সাহায্যে কেটে সরিয়ে ফেলা হয়। অনাবৃত কয়লা খুব সহজেই তুলে আনা যায়। এক্ষেত্রে যেহেতু কয়লার স্তর অনাবৃত এবং বায়ুর সংস্পর্শে থাকে তাই আগুন ধরার সম্ভাবনাও বেশি থাকে। যে যে কারণে খনিতে আগুন লাগার সম্ভাবনা থাকে সেগুলি হলঃ
- ঝড়-বৃষ্টির সময় বজ্রপাতের ফলে আগুন লাগতে পারে।
- বিভিন্ন কারণে খনির ধারে প্রচুর আবর্জনা জমে। সময়মত সেগুলি সরিয়ে না ফেললে তাতে পচন ধরে। এর ফলে যে তাপ সৃষ্টি হয় তা থেকে খনিতে আগুন ধরে যেতে পারে।
- অসাবধানতার কারণে আগুন লেগে যেতে পারে।
- নিরাপত্তায় ফাঁক থাকলে নানা কারণে খনিতে আগুন ধরতে পারে।
- খনির কাছাকাছি আগুন জ্বালালে, অসাবধানতাবশতঃ তা থেকে আগুন লাগতে পারে।
বর্তমানে ঝরিয়াতে ৩২টি খনি আছে। এগুলির মধ্যে ২৩টি আন্ডারগ্রাউন্ড খনি এবং ৯টি ওপেন কাস্ট খনি।
কোনো বাড়িতে বা এলাকায় আগুন লাগলে আমরা ফায়ার ব্রিগেডের লোকেদের জল দিয়ে আগুন নেভাতে দেখি। তাই অনেকের মনে হতে পারে যে আগুন নেভানোর জন্য ঝরিয়াতে খনির ভিতরে জল ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে না কেন? জল দিয়ে এই আগুন নেভানোয় সমস্যা আছে। সমস্যাগুলি হলঃ
- অত জল কোথা থেকে পাওয়া যাবে? পাওয়া গেলেও তা খনি পর্যন্ত নিয়ে আসতে এবং খনি ভর্তি করতে যে খরচ হবে তা হয়তো পুড়ে যাওয়া কয়লার মূল্যের চেয়ে বেশি।
- লক্ষ লক্ষ গ্যালন গ্যালন জল ঢেলেও সম্পূর্ণ সিম জলে ঢেকে রাখা সম্ভব নয়।
- জ্বলন্ত খনিগর্ভে প্রচন্ড তাপ সৃষ্টি হয়। জল ঢোকালেই তা বাষ্পে পরিণত হবে। এতে খনির ভিতরে প্রচন্ড চাপ তৈরি হবে। এরফলে যদি কোনো বিস্ফোরণ ঘটে তাহলে পুরো এলাকা আগুনের গ্রাসে চলে যাবে।
- শুকনো কয়লা জলের সংস্পর্শে এলে জল শুষে নেয়। সেই সময় তাপ বৃদ্ধি ঘটে (due to exothermic reaction )। এরফলে ওই কয়লাতেও আগুন ধরে যাবার সম্ভাবনা থাকে।
শুধু ভারতেই নয়, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের কয়লা খনিগুলিতেও এমন বিপর্যয় ঘটতে দেখা গেছে। সেন্ট্রালিয়া (Centralia), পেনসিলভানিয়া (Pennsylvania) কয়লা খনিগুলিতে ৫০ বছর ধরে আগুন জ্বলছে। নেভানো যায় নি। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়েও এই ধরনের বিপর্যয়ের মোকাবিলায় পৃথিবীর কোনো দেশই ৪৫ শতাংশর বেশি কৃতকার্য হতে পারেনি। বর্তমানে পৃথিবীতে ২২ টি দেশকে এই ধরনের বিপর্যয়ের মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে ঝরিয়ার আগুন আয়ত্বে আনতে না পারলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে। ৩৩নং জাতীয় সড়কের দিকে এই আগুন এগিয়ে যেতে পারে। আর তা যদি হয় তা হলে এই এলাকার নিকটবর্তী রেলপথ সঙ্কটে পড়বে। এই রেলপথ দিয়ে রাজধানী ও শতাব্দীর মত গাড়ি চলাচল করে।
তাহলে এখন কী করণীয়? বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এই অঞ্চলে যে সিম অর্থাৎ কয়লার স্তর আগুনের স্পর্শের বাইরে আছে তা যত শীঘ্র সম্ভব তুলে ফেলা উচিত। তাহলে বিপর্যয় অনেকটা ঠেকানো যাবে। তবুও একটা প্রশ্ন থেকে যায়। এই বিপুল পরিমাণ কয়লা তো রাতারাতি তোলা সম্ভব নয়? সময় লাগবে। ততদিনে আরও কিছুটা ক্ষতি হবে। সেটুকু মেনে নিতে হবে। ক্ষতির পরিমাণ যত কমে তত ভাল। তাই শুধু পরিকল্পনা না করে, প্রয়োজনীয় কাজ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শুরু করা উচিত।

কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়
জনপ্রিয় বিজ্ঞান ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে লেখালেখি।
