হজকিন লিম্ফোমা

নাম শুনেই বোঝা যায় এটা অসুখ সংক্রান্ত বিষয়। বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। 1832 সালে Dr. Thomas Hodgkin এই বিষয়টি নিয়ে বেশ কিছু কাজকর্ম করেন। তিনি প্রথম ধরেন যে এই অসুখটি কোনো সংক্রমণ (infection) নয়, এটা এক ধরনের ক্যানসার। প্রথম দিকে এই অসুখটি Hodgking’s Disease নামেই চলত। পরে বিংশ শতাব্দীতে Hodgkin’s Lymphoma নামকরণ হয়। এছাড়াও এটি Lymphatic cancer নামেও পরিচিত।
আমাদের শরীরে একটা প্রতিরোধ ব্যবস্থা আছে। পোশাকি নাম Lymphatic system। এই ব্যবস্থায় অনেক কুশীলব আছে। যেমন, লসিকা (lymph), প্লীহা ইত্যাদি। এরা সদা ব্যস্ত থাকে রোগ প্রতিরোধ করার কাজে। আমাদের রক্ত কণিকা বয়ে নিয়ে যাবার জন্য যেমন পাইপ লাইন আছে , অনেকটা সে রকম। রক্ত চলাচল জারি রাখার জন্য একটি পাম্প , অর্থাৎ আমাদের হৃদয় আছে, এক্ষত্রে সেরকম কোন কিছু নেই। এই ব্যবস্থায় নালিগুলি নিজে নিজেই সংকোচন প্রসারণ হয়। তাছাড়া দৌড় ঝাঁপ করলেও কাজ হয়ে যায়। এদের নালিগুলির মধ্যে একমুখী ভালব আছে যা লসিকা (lymph) কে সমানের দিকে ঠেলে দেয়। এইভাবেই লসিকা ঘুরে বেড়ায়। এই vessel গুলি রক্ত নালির সাথেও যুক্ত থাকে। vessel গুলি স্থানে স্থানে যুক্ত হয়ে গ্রন্থি গঠন (lymph nodes) করে। সংখ্যায় প্রায় 600 এর মতো। লসিকা (lymph) আসলে একধরনের পরিষ্কার বর্ণহীন তরল পদার্থ। লাতিন ভাষায় lympha মানে জল।এই lymph এর মধ্যে আছে রক্তের শ্বেত কণিকা। এর অপর নাম lymphocytes।
Lymphoma হচ্ছে ক্যানসার যা শুরু হয় শ্বেত কণিকা বা lymphocytes এর মধ্যে। দু ধরনের lymphoma হয়—
(1) Hodgkin’s Lymphoma ( HL) এবং
(2) Non Hodgkin’s Lymphoma (NHL )
আমাদের আলোচনা হবে শুধু Hodgkin’s Lymphoma ( HL) বিষয়ে। কিভাবে বোঝা যাবে ?
সাধারণত গলাতে, বগলে বা কুচকি তে একটু ফোলা, ঢিবি মতো দেখা দেয়। কোনো ব্যাথা থাকেনা। সর্বদা একটা ক্লান্তি ঘিরে থাকে। সামান্য কিছু খাবার পর পেটটা ফোলা ফোলা ভাব। জ্বর থাকতে পারে। রাতে ঘুমের মধ্যে খুব ঘাম ঝরে। কখনও কখনও খুব চুলকানি আসে। মদ্য পানে ব্যাথা অনুভূতি বাড়ে। হঠাৎ করে ওজন কমে যেতে পারে।
এই সব চিহ্নগুলি একা বা একসাথে দেখা যেতে পারে। এই অসুখ শরীরের যে কোন অংশেই শুরু হতে পারে। তবে শরীরের উর্ধ অংশেই বেশীর ভাগ শুরু হয়। চিকিৎসা না করলে এই ক্যানসার শুরুর জায়গা থেকে অন্য লসিকা গ্রন্থি তে (lymph node ) ছড়িয়ে পড়ে, এবং বেশ তাড়াতাড়ি। বিনা চিকিৎসায় যারা থাকেন তাদের ক্ষত্রে এ ক্যানসার lymph system থেকে রক্তের মধ্যেও ঢুকে পড়ে। ফল যকৃৎ, ফুসফুস এমনকি মজ্জা তেও ছড়িয়ে যায়। আশার কথা এই অসুখের ভাল চিকিৎসা আছে। অবশ্যই যত আগে শুরু করা যায় তত মঙ্গল। স্টেজ চার পর্যন্ত চিকিৎসা করা সম্ভব এবং রোগী একদম সুস্থ হয়ে যায়। ভাল হয়ে যাবার পরও ,অতি সামান্য ক্ষেত্রে হয়ত আবার এই অসুখ দেখা দিতে পারে কিন্তু তখনও চিকিৎসা করা যায়। আক্রান্ত মানুষটি রোগ মুক্ত হওয়ার পর ঠিক কতদিন বেঁচে থাকবে সেটা কোন চিকিৎসক বলতে পারেনা। এটুকু জানাচ্ছেন এই অসুখের ক্ষেত্রে চিকিৎসায় রোগ মুক্ত হবার পর, বেঁচে থাকার সম্ভবনা বেশ উজ্জ্বল । এই অসুখ সাধারণত হয় কুড়ি বা আশে পাশে বয়সে , না হয় বয়স যখন সত্তর এর ঘরে।
মূল কোষ lymphoctes হল এক ধরনের শ্বেত কণিকা। এই শ্বেত কণিকা আবার দু ধরনের ,B এবং T । T কে আবার তিন ভাগে ভাগ করা হয়। Hodgkin’s Lymphoma র ক্ষেত্রে গণ্ডগোল B কোষের মধ্যে। Hodgkin’s Lymphoma কে অনেক ভাবে ভাগ করা হলেও বেশি ভাগ Classic Hodgkin’s Lymphoma র মধ্যেই পরে। বলা যায় 90 শতাংশ ।
এখন প্রশ্ন হল এই অসুখ হয় কেন? সদুত্তর চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা দিতে পারেননি। তবে এটুকু জানিয়েছেন যে কিছু বিশেষ শ্বেত কণিকার মধ্যস্থিত DNA এর গঠনের হঠাৎ পরিবর্তন এই অসুখের জন্য দায়ী। বিজ্ঞানের ভাষায় মিউটেশন বলা হয়ে থাকে। সেই কোষগুলিকে চিহ্নিত করা গেছে। তাদের নাম B lymphocytes । তারা হঠাৎ করে সংখ্যায় অনিয়ন্ত্রিত ভাবে বেড়ে চলে। এক বা একাধিক লসিকা গ্রন্থির মধ্যে। প্রথমে ঘটে কোন নির্দিষ্ট স্থানে, যেমন গলায় বা কুঁচকিতে, তারপর এক গ্রন্থি থেকে অন্য গ্রন্থিতে এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে। এই অসুখ কার হবে যেমন বলা যায়না তেমনি এই অসুখ আটকাবার কোন ব্যবস্থাও এখনো জানা নেই।
আবারও বলি এর সুচিকিৎসা আছে। সেটা কেমো বা বিকিরণ বা উভয়ই একত্রে হতে পারে।

মিহির রঞ্জন সাহা
বিজ্ঞান লেখক।
