আগামী ৩০ বছরের মধ্যে আফ্রিকান গ্রেট এপ্সদের সংখ্যা ক্রমশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে

জলবায়ুর পরিবর্তন, ভূমি ব্যবহারের ধরনের পরিবর্তন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রভাবে আফ্রিকার গ্রেট এপ্স অর্থাৎ গোরিলা,শিম্পাঞ্জি এবং বেবুনের সংখ্যা ভীষণ ভাবে হ্রাস পাবে।
গবেষকরা প্রায় ২০ বছর ধরে শতাধিক স্থান থেকে সংগৃহীত আফ্রিকান এপ্সদের জনসংখ্যা, সম্ভাব্য বিপদ ও সংরক্ষণের উপায় IUCN SSC A.P.E.S. ডাটাবেসে সংকলিত করেছেন । এই তথ্য বিশ্লেষণ করে তাঁরা আফ্রিকান এপ্সদের জনসংখ্যার উপর কি প্রভাব পড়তে চলেছে তার একটা সুস্পষ্ট ধারনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
২০৫০ সালের মধ্যে আফ্রিকান এপ্সদের ওপর জলবায়ু, ভূমি ব্যবহার, ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রভাব কি হতে পারে তা নির্ধারণ করার জন্য গবেষকরা দুটি পরিস্থিতির অবতারণা করেছেন -‘ ভালো পরিস্থিতি’ এবং ‘মন্দ পরিস্থিতি’। ভালো পরিস্থিতির অর্থ- ধীরে ধীরে কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ। মন্দ পরিস্থিতির অর্থ অনিয়ন্ত্রিত কার্বন নিঃসরণ ও মাত্রাতিরিক্ত পরিবেশ দূষণ।
ভালো পরিস্থিতিতে গ্রেট এপ্সদের সংখ্যা ৮৫ শতাংশ কমবে। এদের ৫০ শতাংশ আবার ন্যাশনাল পার্কের বাইরে বসবাস করে। ন্যাশনাল পার্কের অভ্যন্তরে বসবাসকারীরাই শুধুমাত্র আইন দ্বারা সুরক্ষিত। মন্দ পরিস্থিতিতে জনসংখ্যার হ্রাস ৯৪ শতাংশ অব্দি হতে পারে। এই সংখ্যার ৬১ শতাংশ বসবাস করে ন্যাশনাল পার্কের বাইরে অসুরক্ষিত অঞ্চলে।
পরীক্ষা করা হবে বর্তমান বাসস্থান থেকে গ্রেট এপ্সরা অন্য কোথাও সরে যাচ্ছে কিনা। উদাহরণ হিসাবে বলা যেতে পারে কিছু কিছু এপ্স প্রজাতি পার্বত্য অঞ্চলের তুলনায় নিম্ন সমতল অঞ্চলে বসবাস করতে অভ্যস্ত। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য নিচু সমতল অঞ্চল ধীরে ধীরে উষ্ণ ও রুক্ষ হয়ে যাচ্ছে। স্বাভাবিক ভাবেই খাদ্যবস্তুও অপ্রতুল হয়ে যাচ্ছে। নিকটবর্তী পার্বত্য অঞ্চলগুলির পরিবেশ হয়ত সুদূর ভবিষ্যতে বর্তমান নিচু সমতল অঞ্চলগুলির গুলির মতো হয়ে যাবে। তখন যদি গ্রেট এপ্সরা নিচু সমতল অঞ্চলগুলি থেকে পার্বত্য অঞ্চলে চলে যায় তাহলে হয়ত তারা বেঁচে যেতে পারে বা বংশবৃদ্ধিও করতে পারে। কিন্তু ২০৫০ সালের মধ্যে তাদের পক্ষে নিচু সমতল অঞ্চল ছেড়ে দূরে চলে যাওয়া বেশ মুশকিল।
লিভারপুলের জন মুরস উনিভার্সিটির গবেষক তথা এই প্রজেক্টের প্রধান ,জোয়ানা কার্ভালহ এর মতে ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিবর্তন,ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি সংক্রান্ত বিষয়গুলি বিশ্লেষণ করলে আফ্রিকান এপ্স দের স্থানান্তরিত হওয়ার সম্ভাব্য কারনগুলি বোঝা যাবে।
কার্ভালহ বলেন ,সংরক্ষিত অঞ্চলের বাইরেই গ্রেট এপ্সদের সর্বাধিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। কারণ বর্তমানে আফ্রিকায় গ্রেট এপ্সদের বসবাসের উপযুক্ত স্থান সংরক্ষনের উপযুক্ত পরিকাঠামোই নেই।
ওয়াইল্ড লাইফ কনসারভেশন সোসাইটির(WCS) ফিওনা মাইসেল বলেন, জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন ধরণের উদ্ভিদ বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশের সন্ধানে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে স্থানান্তরিত হবে । তাদের সাথে সাথে এপ্স সহ অন্যান্য জীবজন্তুও বাঁচার উপযুক্ত পরিবেশ পাওয়ার জন্য উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে চলে যাবে। যার ফলে সমতল অঞ্চল থেকে এরা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। শুধু তাই নয় পর্বতের উচ্চতা যদি খুব একটা বেশি না হয় তাহলে ছোট বড় সমস্ত প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদকূল বসবাসের উপযুক্ত স্থান বা পরিবেশ পাবে না এবং কালক্রমে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
গবেষকদের মতে প্রত্যেকটি প্রজাতির সংরক্ষণের জন্য সঠিক পরিকল্পনা করতে হবে। সংরক্ষিত অঞ্চলের সংখ্যা আরো বাড়াতে হবে। যেসমস্ত অঞ্চলগুলিতে ভবিষ্যতে গ্রেট এপ্সদের চলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে সেই অঞ্চল গুলির সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে। সংরক্ষণবিদদের ভূমি ব্যবহারের সুষ্ঠ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে , জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে হবে। সর্বোপরি গ্রেট এপ্সদের সংরক্ষনের জন্য সরকারি স্তরে কর্মপন্থা নিদৃষ্ট করতে হবে, সংরক্ষন নীতি প্রণয়ন করতে হবে।
গবেষণায় বিশেষ ভাবে বলা হয়েছে ভবিষ্যতে গ্রেট এপ্স সহ সমস্ত উদ্ভিদ ও প্রাণীকূলকে সংরক্ষন করতে গেলে জলবায়ুর পরিবর্তন রুখতে হবে।
সরকারকে গ্রেট এপ্সদের বাসভূমি সংরক্ষনের কথা ভাবতে হবে। গ্রেট এপ্সদের জীবন ও বাসভূমির সুরক্ষা তথা সংরক্ষন এবং জলবায়ুর পরিবর্তন ইত্যদি নানা বিষয় নিয়ে আফ্রিকা সরকার সেপ্টেম্বরে বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি CoP ১৫, ও নভেম্বরে UN ক্লাইমেট চেঞ্জ কনফারেন্সে যোগদান করবে। আশা করা যায় এই কনফারেন্সগুলিতে গ্রেট এপ্স সংরক্ষন এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত অর্থপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে।
আফ্রিকান এপ্সদের সাথে সাথে তাদের তাদের বাসযোগ্য ভূমির পরিমান ও নাটকীয় ভাবে কমে যাচ্ছে। বিপদের ভিত্তিতে সমস্ত আফ্রিকান গ্রেট এপ্সদের দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়। প্রথম শ্রেণী হল বিপন্ন প্রজাতি। এই শ্রেণীতে রয়েছে মাউন্টেন গরিলা,বনবস(Bonbos),নাইজেরিয়ান ক্যামেরুন শিম্পাঞ্জি, ইস্টার্ন শিম্পাঞ্জি, ও সেন্ট্রাল শিম্পাঞ্জিরা। দ্বিতীয় শ্রেণী হল সাংঘাতিক বিপন্ন প্রজাতি। এদের মধ্যে রয়েছে ক্রস রিভার গরিলা, গ্রাউর’স গরিলা(Grauer’s Gorilla), ওয়েস্টার্ন লো ল্যান্ড গরিলা,ও ওয়েস্টার্ন শিম্পাঞ্জিরা ।এই সমস্ত প্রজাতির নাম আই ইউ সি এন এর (IUCN) এর রেড লিস্ট এ আছে। বিপন্ন প্রজাতির এই প্রাণীগুলিকে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ফ্ল্যাগশিপ স্পিসিস(Flagship Species) ধরা হয় অর্থাৎ এগুলির জরুরিভিত্তিতে সংরক্ষন প্রয়োজন।
লেইপজিগ্ জার্মানির হিজালমার কুহল বলেন, গ্রেট এপ্সদের রক্ষা করার দায়িত্ব কিন্তু সমগ্র বিশ্বের। কারণ সমগ্র বিশ্বের মানবজাতির প্রয়োজন মেটানোর জন্য গ্রেট এপ্সদের বাসভূমি থেকে মাত্রাতিরিক্ত ভাবে প্রাকৃতিক বস্তু সংগ্রহ করা হয়। তাই বিশ্ববাসীকে শুধুমাত্র নিজেদের স্বার্থের কথা না ভেবে গ্রেট এপ্সদের করুন পরিণতির বিষয়ে একটু সচেতন হতে হবে। গ্রেট এপ্সদের সুরক্ষার স্বার্থে, তাদের বাসভূমির যথেচ্ছ শোষন বন্ধ করতে হবে। স্থানীয় মানুষদের সাস্টেনেবল অর্থনীতি বিকাশের পথ দেখতে হবে।

অরুন্ধতী চৌধুরী
স্নাতক স্তরে প্রাণীবিদ্যায় অনার্স
স্নাতকোত্তর স্তরে পরিবেশ বিজ্ঞান
ডকুমেন্টারি ফিল্মের জন্য বিভিন্ন শিক্ষামূলক বিষয় সম্পর্কিত স্ক্রিপ্ট লিখেছেন। থিয়েটার মুভমেন্ট থেরাপি নিয়ে কাজ করেন।
