রায়গঞ্জের কুলিক পাখিরালয়ের নতুন অতিথি খয়রা কাস্তেচরা বা গ্লসি আইবিস

রায়গঞ্জ বিভাগের আওতাধীন রায়গঞ্জ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য যা কিনা কুলিক পাখিরালয় নামে বিশেষ পরিচিত। এখানে বহু বছর ধরে শামুখোল, পানকৌড়ি, ইগ্রেট জাতের বক ইত্যাদি প্রজাতির জলচর পাখিরা প্রজনন ঋতুতে হাজারে হাজারে সংখ্যায় এসে উপস্থিত হয়। এরা এসে এখানে বাসা বাঁধে,বাসায় ডিম পাড়ে, ডিম ফুটে বাচ্চা লালন-পালন করে।আবার বর্ষার শেষে বা শীতের শুরুতে বাচ্চাদের বড় করে ও ওড়ান শিখিয়ে – পড়িয়ে সবাই যে যার জায়গায় চলে যায়। সবার কাছে এটা বেশ পরিচিত দৃশ্য। ২০২৩ পর্যন্ত সবকিছু এভাবেই চলছিল।
তবে গত ২০২৪ সালে এখানে আরেকটি নতুন প্রজাতির জলের পাখিকে আসতে দেখা গেছে তারা হল খয়রা কাস্তেচরা ইংরেজিতে যাকে বলে Glossy Ibis (Plegadis falcinellus), কুলিক পাখিরালয়ে একদম নতুন প্রজাতির সংযোজন। তার আগে এমন কোন জলজ পাখি এখানে রেকর্ড করা হয়নি। এই অভয়ারণ্যের বন-আধিকারিক হিসাবে আমিই প্রথম সবার সামনে এই তথ্য তুলে নিয়ে আসি। নিঃসন্দেহে এই ঘটনা কুলিক পাখিরালয়ে এক নতুন সংযোজন ও বড় সাফল্য।


২০২৪ সালের ২২শে জুলাই তারিখে প্রথম প্রায় ২০০ সংখ্যক খয়রা কাস্তেচরা এই অভয়ারণ্যের উপরে উড়তে দেখা গেছে। প্রতিটি দল ছিল প্রায় এরকম ৯ থেকে ১২টি সংখ্যক পাখি। একজন সাধারণ দর্শক হিসাবে প্রথমে এদেরকে ওপেনবিল বা শামুকখোল বা করমোরেন্টের বা পানকৌড়ি মতো দেখায়। তবে আমার এদের চিনতে কোনো ভুল হয়নি। নিরলস তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ এবং তাদের স্বতন্ত্র আকৃতি দেখে প্রথম আমি এদের সনাক্ত করি। এরাই হল খয়রা কাস্তেচরা বা গ্লসি আইবিস।
পরের দিন দেখা যায় যে এদের একটি ঝাঁক নির্দিষ্ট গাছের ডালে বাসা বাঁধার করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সেই গাছটি ইতিমধ্যেই শামুকখোল বা ওপেনবিল, বক বা ইগ্রেট, বাঁচকা বা নাইট হেরন দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল। বনের নতুন অতিথিদের অন্য প্রজাতিরা প্রথমেই সহজে বরণ করে নিয়ে তাদের জায়গা ছেড়ে দেয়নি। খয়রা কাস্তেচরা প্রথমে অন্যান্য প্রজাতিগুলোর সাথে জায়গা দখলের জন্য লড়াই শুরু করে।


তারপর লড়াইয়ের পরে কিছু পাখি আরেকটি গাছে উড়ে যায়। সেই গাছটিতে মাত্র একটি পুরুষ ও স্ত্রী দুটি পাখি সেই গাছে থেকে যায়। পরের দিন সেখানে এদের বাসা তৈরি শুরু করতে দেখা গেছে। দেখা যায় যে মাত্র দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে তারা বাসা তৈরি করে ফেলেছে। প্রায় এক থেকে দুই সপ্তাহ পরে একটি নীল বা ফ্যাকাশে নীল রঙের ডিম পাড়তে দেখা গেছে। এক থেকে দুই সপ্তাহ পরে ডিমের খোসা মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তার মানে বুঝতে পারি বাচ্চারা সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে ডিম ফুটে বেড়িয়েছে।
সেই বছরের ২৫শে অগাষ্ঠ পর্যন্ত ছানাগুলো সেখানেই ছিল। ২০২৪ সালের ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বর অভয়ারণ্যের সব পাখি গননার অনুশীলনের কর্মসূচী হাতে নেওয়া হয়। সেই কর্মসূচীতে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা,স্বুলের ছাত্র-ছাত্রীরা, ফটোগ্রাফার আমাদের বিভাগীয় কর্মীদের সাথে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। সেই সময় দেখা যায় যে কিছু খয়রা কাস্তেচরা পাখির বাসায় ছানাগুলো সংখ্যায় ছিল তিনটি করে আবার কোনটার বাসায় দুটো করে। তখন কিছু বাচ্চা ছিল যাদের সেই সময় গণনা করা হয়েছিল।
এখানে প্রজনন মরশুমের শেষে বিভিন্ন প্রজাতির গণনায় দেখা গেছে ২০২৪ সালে রেকর্ড সংখ্যক অর্থ্যাৎ বিভিন্ন প্রজাতির মোট ৯৬৭১৯টি পাখি দেখা গেছে। তারমধ্যে শামুকখোলের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি ৭১০২২টি, তারপর ছিল ইগ্রেট ১৬২৮২টি,পানকৌড়ি ছিল ৬১৪৩টি, নাইট হেরন বা বাঁচকা-৩০২১টি আর নতুন প্রজাতি খয়রা কাস্তেচরা বা গ্লসি আইবিসের সংখ্যা ছিল ২৫১টি। এখনও পর্যন্ত এখানে এত বেশি সংখ্যক পাখির সমাবেশ ও প্রজনন সাফল্য কুলিকের ইতিহাসে মনে হয় সর্বপ্রথম দেখা গেল।

মা-বাবাকে সবসময় সক্রিয়ভাবে নজরদারিতে থাকতে দেখা গেছে। বাসা তৈরি, ছানা প্রতিপালন উভয়েই অংশ নেয়। যদি একজন সবসময় বাসা তৈরির উপাদান খুঁজে বা খাবার সংগ্রহের জন্য বাইরে থাকে, তবে আরেকজনকে দেখা যায় অতন্দ্র প্রহরীর ভুমিকায়। প্রথমে এলাকা দখলের প্রতিযোগিতা থাকলেও পরে অন্যান্য হেরনদের সঙ্গে মিলে-মিশে নিরাপদ বোধ করে। বাঁশের ঝোপ বা পিঠালি গাছে মাঝারি উঁচ্চতায় বাসা বাঁধার জায়গা হিসাবে পছন্দ করতে দেখা গেছে।
যখনই তারা বাইরে থেকে নিজেদের নির্দিষ্ট বাসায় ফিরে আসে তখন সরাসরি বাসায় ফিরে যেতে দেখা যায় না। প্রথমে এরা কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়ায় এবং অন্য ঝোপঝাড়ের দিকে উঁকি- ঝুঁকে মারে, কিছু শিকারী বা পর্যবেক্ষককে বিভ্রান্ত করার জন্যই হয়তো তারা এই ধরনের আচরণ করে।
এই প্রথমবারের মতো এই অভয়ারণ্যে নতুন প্রজাতিকে স্বাগত জানানো হচ্ছে। সেই কারণেই রায়গঞ্জ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা শ্রী ভূপেন বিশ্বকর্মার অনুমতি নিয়ে প্রথমত, যেখানে খয়রা কাস্তেচরারা পছন্দ করে এমন সমস্ত ঝোপে বা গাছের ডালপালার কাছে অস্থায়ী ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছে এবং দর্শনার্থীদের জন্য পথ আলাদা করে বিকল্প পথ তৈরি করা হয়েছে। বাসা তৈরি এবং প্রজনন প্রক্রিয়ার সাফল্যের জন্য কোনও সংবাদ মাধ্যমের লোকজনদের, আলোকচিত্রীকে এক সপ্তাহের বেশি অনুমতি দেওয়া হয়নি। অন্তত পাখিদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে তা করা হয়েছিল যাতে পরবর্তী সময়ে আরও পাখিপ্রেমী পর্যটকদের ভীড় না বাড়ে।
এই চলতি বছরে আগামী প্রজনণ মরশুমে আশা করা যায় এই নতুন অতিথি আরও বেশি সংখ্যায় এবং বেশি জায়গায় অন্যান জলচর পাখিদের সঙ্গে দেখা যাবে। তাই আমাদের ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশে এই বিরল প্রজাতির পাখির সুরক্ষার স্বার্থে আমরা কুলিকে আরও বেশি সংখ্যক খয়রা কাস্তেচরা যুক্ত করার সাফল্য অর্জনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি।আগামী দিনে নতুন প্রজাতি খয়রা কাস্তেচরা বা গ্লসি আইবিসের সম্পর্কে আরো নুতন তথ্য সংযোজন ও বিজ্ঞান সম্মত গবেষণা করার চেষ্টা করা হবে।
কুলিক পাখিরালয়ে প্রজনণ মরশুমে খয়রা কাস্তেচরা বা গ্লসি আইবিস ও শামুখোল পাখি ( ছবি সংগ্রহ লেখিকা নিজে)

মধুমিতা পাত্র
রেঞ্জ অফিসার, কুলিক পাখিরালয়, রায়গঞ্জ, উত্তর দিনাজপুর
