Free ArticlesMathematics-গণিতPopular Science-জনপ্রিয় বিজ্ঞান

ফিল্ডস মেডেল ও আবেল প্রাইজঃ গণিতের আঙিনার দুটি সর্বোচ্চ স্বীকৃতি

Fields-Abel-Prizes-in-Mathematics

বিজ্ঞানের জগতে নোবেল পুরস্কার নিঃসন্দেহে এখন নামে ও গুরুত্বে সব থেকে সম্ভ্রমজাগানো পুরস্কার। বিজ্ঞানের তিনটি শাখাতে এই পুরস্কার রয়েছে সেই ১৯০১ সাল থেকেই। কিন্তু গণিত কোথায়? গণিতের কোন পুরস্কার তো নোবেলের আওতায় আসে নি। অথচ এমন একটি সুপ্রাচীন জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র, সর্বদাই এক শ্রেণির মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের আকর্ষণ করে চলেছে। বিষয়টি সম্ভবত গণিতবিদদের কিছুটা হতাশ করেছিল।

John Charles Fields
জন চার্লস ফিল্ড

বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকেই গণিতবিদদের বিভিন্ন গোষ্ঠী চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন কীভাবে সর্বোচ্চ মানের গণিতজ্ঞদের কোনো আন্তর্জাতিক সম্মান প্রদান করা যায়। তাদের নিজস্ব সম্মেলন গণিতের আন্তর্জাতিক কংগ্রেস প্রতি চার বছরে একবার অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে এবং বহু দেশের গণিতবিদেরা সেখানে মিলিত হন। ১৯২৪ সালে কানাডার টরেন্টোতে এই কংগ্রেসে পুরস্কার দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হল যে, দুটি মেডেল দেওয়া হবে দু’জন বিশিষ্ট গণিতজ্ঞকে। কানাডার গণিতজ্ঞ ও ১৯২৪ এর কংগ্রেসের সভাপতি জন চার্লস ফিল্ডের (John Charles Fields) নামে চালু হয়ে গেল পুরস্কার; ফিল্ডস মেডেল।

জন চার্লস ফিল্ডের জন্ম কানাডাতে ১৮৬৩ সালে। তিনি তার ছাত্রজীবনের একটা অংশ কাটিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ফিল্ডস কিন্তু সেই সময়কার কানাডা বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোন দেশের গণিত গবেষণার ধারা কিংবা তার মানে খুব একটা সন্তুষ্ট হতে পারেন নি। তিনি ১৮৯১ নাগাদ জার্মানিতে এসে মূলত বার্লিন এবং গটিনজেনের সেই সময়কার প্রথম সারির গণিতজ্ঞদের সঙ্গে গবেষণার কাজ শুরু করেন। এই গণিতজ্ঞদের অন্যতম ছিলেন ফ্রবেনিয়াস, ফেলিক্স ক্লাইন এবং পদার্থবিদ হিসেবে বেশি পরিচিত ম্যক্স প্ল্যাঙ্ক ও অন্যান্যরা। ফিল্ডস প্রায় দশ বছর ইওরোপে কাটিয়ে কানাডায় ফিরে যান এবং কানাডা তথা উত্তর আমেরিকায় গণিত গবেষণার একটি উচ্চ মানের ধারা তৈরি করেন।

প্রথম ফিল্ডস মেডেল দেওয়া হল দু জনকে, ১৯৩৬ সালে। পুরস্কারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তা চালু হওয়ার মধ্যে বেশ কয়েকটি বছর চলে গেল। কারণ লক্ষ্য ছিল পুরস্কারের নিয়মাবলী একটা ঐক্যমতের ভিত্তিতে স্থির করা। ঠিক হলো, চার বছর অন্তর অনুষ্ঠিত গণিতজ্ঞদের আন্তর্জাতিক সন্মেলনে মেডেল দেওয়া হবে এমন দুজন গণিতজ্ঞকে যাদের বয়স চল্লিশের মধ্যে। এই সিদ্ধান্তের পিছনে খুব বড় কারণ ছিল যে, কোন প্রথম সারির গণিতবিদ তার চল্লিশ বছরের মধ্যে নিশ্চয়ই তার প্রতিভার সাক্ষর রাখতে পারবেন। আবার পুরস্কার লাভের পরেও তিনি কর্মজীবনের পরবর্তী অংশে গণিতে আরও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবেন। অর্থাৎ পুরস্কার যেমন প্রাপকের কাজের একটি স্বীকৃতি দেবে, সঙ্গে সঙ্গে থাকবে বৃহত্তর কাজের জন্য উৎসাহ প্রদান। ১৯৬৬ থেকে আরও দুটি মেডেল যুক্ত হলো। তাই এখন চার বছর অন্তর চারজন পর্যন্ত ফিল্ডস মেডেল পেতে পারেন। ২০২২ পর্যন্ত মোট ৬৪ জন ফিল্ডস মেডেল জয়ীর মধ্যে দু’জন ভারতীয় বংশোদ্ভূত গণিতজ্ঞ রয়েছেন। প্রথমজন, মঞ্জুল ভার্গব যিনি কানাডা-মার্কিন যুক্তরষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে ২০১৪ সালে এই সম্মান অর্জন করেন। ২০১৮ সালে ফিল্ডস মেডেল জয়ী অক্ষয় ভেঙ্কটেশ জন্মসূত্রে ভারতীয় এবং অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক।

মঞ্জুল ভার্গব মূলত নাম্বার থিয়োরিতে গবেষণাকাজ করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য অবদান ভার্গব ফ্যাক্টোরিয়াল এবং ভার্গব কিউব ইত্যাদি। বর্তমানে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক। গণিত ছাড়া ভারতীয় সঙ্গীত ও সংস্কৃত ভাষায় তার বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। তিনি একজন বিশিষ্ট অধ্যাপক হিসেবে যুক্ত রয়েছেন আমাদের দেশের মুম্বাইয়ের টাটা ইন্সটিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ এবং ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব সায়েন্স এর সঙ্গে।

২০১৮ এর ফিল্ডস মেডেল জয়ী অক্ষয় ভেঙ্কটেশের জন্ম নয়া দিল্লীতে। দু’বছর বয়সে তিনি তার বাবা-মায়ের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান। সেখানে তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র হিসেবে চিহ্নিত হন ও অনেক কম বয়সে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করেন। ভেঙ্কটেশ বর্তমানে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব অ্যাাডভান্সড স্টাডিজ এ অধ্যাপনা করছেন। তার গবেষণাক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে, সমবন্টন সমস্যা, কাউন্টিং, বীজগণিতীয় টপোলজি প্রভৃতি। ভার্গব এবং ভেঙ্কটেশ দু’জনেই আরও অনেকগুলি আন্তর্জাতিক নামী পুরস্কার জয় করেছেন।

ফিল্ডস মেডেল জয়ীদের মধ্যে ইরানের গণিতজ্ঞ মারিয়াম মির্জাখানি একটি উল্লেখযোগ্য নাম। তিনি প্রথম মহিলা হিসেবে ২০১৪ সালে এই মেডেল তিনি জয় করেন। দুঃখের বিষয় যে, ২০১৭ সালে মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তিনি প্রয়াত হন। তারপরে ২০২২ সালে ইউক্রেনের গণিতবিদ মারিনা ভিয়াজোভস্কা দ্বিতীয় মহিলা হিসেবে ফিল্ডস মেডেল জয়ী হয়েছেন। সবথেকে কম বয়সে এই শিরোপা পেয়েছেন ফরাসী গণিতজ্ঞ জাঁ পিয়ের সের‍্যে, মাত্র ২৭ বছর বয়সে, ১৯৫৪ সালে। তাকে নিয়ে মোট পাঁচজন গণিতজ্ঞের ঝুলিতে রয়েছে, ফিল্ডস মেডেলের সঙ্গে সঙ্গে গণিতের অপর নামী স্বীকৃতি আবেল পুরস্কারও। আশা করা যায়, তুলনায় যে তরুণ গণিতবিদেরা এখন ফিল্ডস মেডেল জয় করেছেন, তাদের আরও অনেকের হাতেই হয়ত ভবিষ্যতে আবেল পুরস্কার উঠে আসবে।

নরওয়ের কিংবদন্তী গণিতজ্ঞ নীলস হেনরিখ আবেল (Niels Henrik Abel) উঠে এসেছিলেন এক সাধারণ পরিবার থেকে। স্কুলে তার গণিতের প্রতিভা এক শিক্ষক চিহ্নিত করেছিলেন। অসলোর রয়েল ফ্রেডেরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় তিনি এমন একটি গাণিতিক সমস্যার সমাধান করেন, যা তার আগের আড়াই’শ বছর ধরে গণিতজ্ঞদের কাছে ধরা দেয় নি। কিন্তু সাতাশ বছরে পা রাখার আগেই যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৮২৯ সালে আবেল প্রয়াত হন। এই সংক্ষিপ্ত জীবনে আবেল গণিতে খুব উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে গেছেন। ফরাসী গণিতবিদ চার্লস হার্মাইটের একটি মন্তব্য আবেলের কাজের পরিধি সম্পর্কে একটা ধারণা দেয়। হার্মাইট বলেছিলেন যে “আগামী পাঁচ’শ বছর গণিত-চর্চাকারীদের যথেষ্ট ব্যস্ত রাখার মত কাজের দিগন্ত আবেল তার স্বল্পায়ু জীবনে খুলে দিয়ে গেছেন”।

নীলস হেনরিখ আবেল (Niels Henrik Abel) | ছবির সূত্রঃ britannica.com

আবেল প্রাইজ কিন্তু অনেক আগে প্রায় নোবেল প্রাইজের সময় থেকেই চালু হতে পারত, অন্তত সেরকম পরিকল্পনা ছিল। নরওয়ের সরকার এবং নরওয়ের কিছু প্রতিষ্ঠান উনবিংশ শতাব্দীতেই স্থির করেছিল যে আবেলের স্মৃতিতে গণিতবিদদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার চালু করা হবে; তার জন্ম শতবর্ষে, অর্থাৎ ১৯০২ সালে। মূলত কিছু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে তা সম্ভব হয়ে ওঠে নি এবং তা ক্রমাগত পিছিয়ে যায়। এই পুরস্কার শেষ পর্যন্ত চালু করে নরওয়ের সংসদ, ২০০২ সালে; আবেলের দ্বিশত জন্মবার্ষিকীতে। প্রথম পুরস্কার দেওয়া হয় ২০০৩ সালে এবং সেই পুরস্কার পান ফরাসী গণিতজ্ঞ জাঁ পিয়ের সের‍্যে, আধুনিক গণিতে তার বিশেষ অবদানের জন্য। তিনিই প্রথম গণিতজ্ঞ যিনি গণিতের আর একটি বিশিষ্ট পুরস্কার, চল্লিশ বছরের কম বয়সীদের জন্য চিহ্নিত ফিল্ডস মেডেলও জয় করেছিলেন।

বয়সে নোবেল পুরস্কারের থেকে এক’শ বছরেরও বেশি ছোট হলেও আবেল পুরস্কারের নিয়মাবলীর সঙ্গে বিজ্ঞান বিষয়ের নোবেল পুরস্কারের নিয়মের কিছুটা মিল রয়েছে। যেমন, এই পুরস্কার প্রতি বছর দেওয়া হয় এবং এখানে প্রাপকের বয়স কোন বাধা নয়। বিজ্ঞানের নোবেলের মতই কোন প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠী নয় কেবলমাত্র জীবিত গণিতবিদদেরা ব্যক্তি হিসেবে আবেল প্রাইজের জন্য নির্বাচিত হতে পারেন। গণিতের যে কোন শাখায় অবদানের জন্য এই পুরস্কার দেওয়া যেতে পারে। এবং নোবেলের মতই একটি বছরে সর্বোচ্চ তিনজন পর্যন্ত গণিতবিদ এই পুরস্কার লাভ করতে পারেন। এখন পর্যন্ত আবেল প্রাইজ জয়ীরা যেভাবে নির্বাচিত হয়েছেন তাতে দেখা যাচ্ছে যে, একজন গণিতবিদের সার্বিক কাজের স্বীকৃতি হিসেবেই তা দেওয়া হচ্ছে; কোন একটি নির্দিষ্ট বা বিশেষ অবদানের জন্য নয়।

২০২৪ পর্যন্ত মোট ২৭ জন গণিতজ্ঞ আবেল পুরস্কারে সন্মানিত হয়েছেন, আর তাদের মধ্যে একমাত্র সাথামঙ্গলম রঙ্গা আইঙ্গার শ্রীনিবাস বর্ধন জন্মসূত্রে ভারতীয় এবং বর্তমানে মার্কিন নাগরিক। তিনি ২০০৭ সালে আবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৪০ সালে বর্ধনের জন্ম সেই সময়কার মাদ্রাজ বা এখনকার চেন্নাইতে। তিনি চেন্নাইতে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশুনা শেষ করে কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে গবেষণা করে ১৯৬৩ সালে পিএইচডি লাভ করেন। আই এস আইতে তার গবেষণা কাজের নির্দেশক ছিলেন বিখ্যাত সংখ্যাতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সি আর রাও। বর্ধন পরবর্তী পর্যায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তার গণিতের গবেষণাকাজ শুরু করেন। তার কাজের অন্যতম ক্ষেত্র হচ্ছে সম্ভাব্যতা তত্ত্ব, বৃহৎ বিচ্যুতির একত্রীভূত তত্ত্ব প্রভৃতি। তার গবেষণাকাজের ব্যাপক প্রয়োগ রয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অনেকগুলি শাখায়।

প্রতি বছর আবেল পুরস্কার তিন জন পর্যন্ত গণিতবিদকে দেওয়ার সুযোগ থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো বছরে তা ঘটে নি। একটি বছরে সর্বোচ্চ দু’জন পর্যন্ত গণিতজ্ঞ এই পুরস্কার পেয়েছেন, ২০০৪, ২০০৮, ২০১৫, ২০২০ এবং ২০২১ এই পাঁচটি বছরে। ২০১৯ সালে এই পুরস্কার প্রথমবারের জন্য লাভ করেছেন একজন মহিলা গণিতবিদ। তিনি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অস্টিনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা কারেন কেস্কুল্লা উলেনবেক।
আবেল প্রাইজের সনদে সর্বোচ্চ মানের গণিতবিদকে সম্মানিত করার পাশাপাশি নরওয়ের নবীন প্রজন্মের কাছে গণিতকে আরও জনপ্রিয় করে তোলার লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে। প্রতি বছর মার্চ মাসে এই পুরস্কার নরওয়ে থেকে ঘোষিত হয় এবং পুরস্কার প্রাপকদের হাতে তা তুলে দেওয়া হয় মে মাসে। আর তাই মে মাসে একই সময়ে তরুণদের জন্য নরওয়েতে উদযাপিত হয় এক বর্ণময় গণিত সপ্তাহ।


ড. ভূপতি চক্রবর্তী

কলকাতার সিটি কলেজের পদার্থবিদ্যা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান। ২০১৩ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত তিনি পদার্থবিদ্যার শিক্ষক, বিজ্ঞানী, গবেষকদের সর্বভারতীয় অ্যাকাডেমিক সংগঠন  ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশান অব ফিজিক্স টিচার্স এর  সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত রয়েছেন বাংলা এবং ইংরাজিতে লেখালেখির মাধ্যমে।