Free ArticlesPopular Science-জনপ্রিয় বিজ্ঞানScience News-বিজ্ঞানের টুকরো খবর

বিজ্ঞানের টুকরো খবর – ১: গবাদি পশুর খাদ্যে সামুদ্রিক শৈবালের প্রয়োগের ফল

গবাদি পশুকে সামান্য পরিমাণ সামুদ্রিক শৈবাল খাদ্যের সাথে মিশিয়ে খাওয়ালে, পাচনক্রিয়ার সময় তারা মিথেন গ্যাসের নিঃসরণ প্রায় ৮২% কম করে। ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার ডেভিসের বিজ্ঞানীরা এই নতুন তথ্যটি পেয়েছেন। ১৭ মার্চ প্লস ওয়ান (PLOS One) জার্নালে প্রকাশিত এই রিপোর্টটি বিশ্বজুড়ে গবাদি পশু উৎপাদনের হারকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।

ডিপার্টমেন্ট অফ অ্যানিম্যাল সায়েন্সের প্রফেসর এবং ওয়ার্ল্ড ফুড সেন্টারের ডিরেক্টর, এরমিয়াস কেবরিব (Ermias Kebreab ) বলেন- তাঁরা প্রমাণ পেয়েছেন যে গবাদি পশুর খাদ্যে যদি সামুদ্রিক শৈবাল মেশানো যায় ,তাহলে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ বেশ খানিকটা কমানো যায়। শুধু তাই নয় এর প্রভাব ও কার্যকারিতাও অনেকদিন পর্যন্ত থাকে। এই গবেষণার কাজে কেবরিব তাঁরই অধীনে গবেষণারত সুযোগ্য ছাত্র ব্রিন্না রককে (Breanna Roque) সঙ্গে নিয়েছিলেন।

feeding cattle with seaweed

এই গবেষণা প্রসঙ্গে রক বলেছেন, এই আবিষ্কার পশু পালকদের গবাদি পশু ও দুগ্ধজাত পণ্য আরো বেশি মাত্রায় উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করবে।

কেবরিব ও রুক টানা পাঁচ মাস ধরে ২১টি গবাদি পশুর ওপর এক পরীক্ষা চালান। এই পাঁচ মাস তাঁরা সামান্য পরিমাণ সামুদ্রিক শৈবাল খাদ্যের সাথে মিশিয়ে নিয়মিতভাবে তাদের খাওয়াতে থাকেন। দেখা যায়, এই ২১টি গবাদি পশুর (যেগুলি ৮০ গ্রাম অর্থাৎ ৩ আউন্স সামুদ্রিক শৈবাল খেয়েছে) ওজন দলের অন্যান্যদের মতোই বেড়েছে। কিন্তু তারা পরিবেশে মিথেন গ্যাসের নিঃসরণ ৮২% কম করেছে। পশুখাদ্যে সামুদ্রিক শৈবালের ব্যবহার কেবরিব ও রুক-ই প্রথম করেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের একটি অন্যতম কারণ হল পরিবেশে গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি। মিথেন হল এরকমই একটি গ্রিনহাউস গ্যাস। ইউনাইটেড স্টেটস-এ গ্রিনহাউস গ্যাসের ১০ % কৃষিকার্যের ফলে উৎপন্ন হয়। এর অর্ধেক আবার উৎপন্ন হয় গরু ও অন্যান্য রোমনন্থনকারী প্রাণীদের রোমন্থন অর্থাৎ জাবর কাটার সময়। এই রোমন্থনকারী প্রাণীরা যখন ঘাস , খড় ইত্যদি খেয়ে সারাদিন ধরে জাবর কাটে তখন মিথেন সহ অন্যান্য গ্যাস তাদের ঢেঁকুরের সাথে নিঃসৃত হয়।

যেহেতু গবাদি পশুরা গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রধান কৃষিজ উৎস তাই জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে গবাদি পশুর মাংস কম খেতে পরামর্শ দেওয়া হয়।

কেবরিব-এর মতে, পৃথিবীর এক ক্ষুদ্র অংশ উর্বর ও কৃষিকার্যের উপযুক্ত। তুলনায় পৃথিবীর অনেকটাই চারণযোগ্য ভূমি। পৃথিবীর জনসংখ্যা যেভাবে বেড়ে চলেছে , তাতে খুব শীঘ্রই ১০ বিলিয়ন পেরিয়ে যাবে। এই বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্যভান্ডারের এক বড় উৎসই কিন্তু গবাদি পশু।

২০১৮ সালে কেবরিব ও রুক দু’সপ্তাহ ধরে গরুকে সামুদ্রিক শৈবাল মেশানো খাবার খাওয়ান। দেখা যায় তারা ৫০% কম গ্রিনহাউস গ্যাস উৎপন্ন করছে। এর আসল কারণ হল সামুদ্রিক শৈবালরা গরুর পৌষ্টিক তন্ত্রে মিথেন উৎপন্নকারী যে উৎসেচকটি আছে তার ক্ষরণে বাধা দেয়।

কেবরিব ও রুক এবার দেখার চেষ্টা করেন যে যৌবনাবস্থায় পাঁচ মাস ধরে এক নাগাড়ে প্রত্যেক দিন নিয়ম করে যদি গবাদি পশুকে সামুদ্রিক শৈবাল খাওয়ানো যায় , তবে পরবর্তীকালে তাদের মধ্যে নিয়ন্ত্রিত হারে মিথেন নিঃসরণের ক্ষমতা থাকছে কিনা – অর্থাৎ একটা দীর্ঘ মেয়াদি প্রভাব থাকছে কিনা|
দেখা যায় যেসব গবাদি পশু এক সময় নিয়ম করে সামুদ্রিক শৈবাল খেয়েছে তারা অন্যদের তুলনায় অনেক কম মিথেন নিঃসরণ করছে আর তাদের এই ক্ষমতা পরবর্তীকালেও এতটুকুও কমেনি।

পরবর্তী ধাপ

এই পর্যায় বিজ্ঞানীরা দেখেন সামুদ্রিক শৈবাল ভক্ষণকারী গবাদিপশুগুলির মাংস বা দুধের গুণগত মান দলের অন্যান্যদের তুলনায় কেমন থাকছে? তাঁরা দেখেন মাংস বা দুধের গুণগত মান ও স্বাদের ওপর এর কোনো প্রভাবই পড়েনি।

বিজ্ঞানীদের মতে আরও একটা বিষয় ভাবার প্রয়োজন আছে। যে সামুদ্রিক শৈবাল সাধারণত পশুখাদ্যে মিশ্রিত করা হয় তা হল Asparagopsis taxiformis। কিন্তু এটিকে বেশি মাত্রায় ব্যবহার করতে হলে এর উৎপাদন ও যোগান বাড়াতে হবে। তাবেই খামারের মালিকরা তাদের গবাদিপশুর জন্য সামুদ্রিক শৈবাল সমৃদ্ধ খাদ্য পর্যাপ্ত পরিমাণে পাবেন।

কেবরিব ও রুক এর সাথে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন সংস্থা সহযোগিতা করছে , যেমন – The Commonwealth scientific and research organisation , James Cook University ( Australia ) , Meat and Livestock Australia , এবং Blue Ocean Barns। এই সংস্থাগুলি যৌথভাবে সামুদ্রিক শৈবালসমৃদ্ধ খাদ্য উৎপাদন ও বিক্রি করতে সচেষ্ট হয়েছে। কেবরিব Blue Ocean Barns সংস্থাটির বিজ্ঞান পরামর্শদাতা।

রুক বলেন, যদিও তাঁদের এখনও অনেক কাজ করা বাকি তবুও তাঁদের পরীক্ষার সাফল্যে তাঁরা বেশ খুশি। তাঁরা বুঝতে পেরেছেন যে সঠিক মাত্রায় সামুদ্রিক শৈবালসমৃদ্ধ খাদ্য ব্যবহার করলে গবাদি পশুর মিথেন নিঃসরণ এর পরিমাণকে অনেকাংশে কমানো যায় এবং তার প্রভাবও দীর্ঘমেয়াদী হয়। এই গবেষণাটি Blue Ocean Barns, the David and Lucile Packard Foundation এবং the Grantham Foundation এর সহোযোগিতায় হয়েছে।

তথ্যসূত্রঃ-

অরুন্ধতী চৌধুরী

স্নাতক স্তরে প্রাণীবিদ্যায় অনার্স
স্নাতকোত্তর স্তরে পরিবেশ বিজ্ঞান
ডকুমেন্টারি ফিল্মের জন্য বিভিন্ন শিক্ষামূলক বিষয় সম্পর্কিত স্ক্রিপ্ট লিখেছেন। থিয়েটার মুভমেন্ট থেরাপি নিয়ে কাজ করেন।