Biography-জীবনীFree Articles

জগদীশচন্দ্রের ভাগ্নে দেবেন্দ্রমোহন বসু

debendra-mohan-bose

জগদীশচন্দ্রের ভাগ্নে দেবেন্দ্রমোহন বসু ভারতবর্ষে আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি একাধারে নিয়মনিষ্ঠ বিজ্ঞানী, অন্যধারে দক্ষ প্রশাসক হিসাবে খ্যাতির চূড়ান্ত শিখরে উন্নীত হয়েছিলেন। তিনি জগদীশচন্দ্র বসু ও সত্যেন বসুর ন‍্যায় এমনই একজন বিজ্ঞানী যিনি কেবলমাত্র ভাগ্যের পরিহাসে নোবেল প্রাইজ থেকে বঞ্চিত হন।

তাঁর পিতৃকুল ও মাতৃকুল উভয়ই বিজ্ঞান এবং শিক্ষায় অভিজাত পরিবার। তাঁর মাতুল জগদীশচন্দ্র বসু বিজ্ঞানের বরপুত্র এবং তাঁর পিতা মোহিনীমোহন বসু, প্রথম ভারতীয় যিনি আমেরিকায় গিয়ে হোমিওপ্যাথি শিখে দেশে ফিরে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হন। তাঁর মাতা সুবর্ণপ্রভা বসু ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী গৃহবধূ যিনি পুত্রের শিক্ষার ব্যাপারে ছিলেন সদা সচেতন আবার তাঁর শরীরগঠনের জন্য খেলাধুলাতেও উৎসাহ দিতেন সর্বদা। এই দুইয়ের প্রভাবে ডি এম বসু জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নীরোগ অবস্থায় বিজ্ঞানের সেবা এবং নানাবিধ কাজ করে গেছেন ক্লান্তিবিহীন ভাবেই।

কৈশোর অবস্থাতেই তাঁর পিতার মৃত্যু ঘটে। ফলে তিনি এবং তাঁর মাতা তাঁর প্রিয় মাতুল অধ্যাপক জে সি বোসের কলকাতার বাড়িতে এসে বসবাস করতে থাকেন। অধ্যাপক বসুর কোন পুত্রসন্তান না থাকায় তিনি তাঁঁর ভাগ্নেকে পুত্রস্নেহে মানুষ করতে থাকেন, তাঁর যথাযথ শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। মাতুলালয়ে তখন বাংলার বিভিন্ন বড় বড় মনীষীর পদার্পণ হতো। ফলে বাল্যবয়স থেকেই দেবেন্দ্রমোহন রবি ঠাকুর, ডঃ নীলরতন সরকার, নিবেদিতা, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ও শিবনাথ শাস্ত্রীর মত ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে আসেন, ফলস্বরূপ তাঁর দৃঢ় মানসিকতা, স্বচ্ছভাবমূর্তি এবং উদার ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে। শিবনাথ শাস্ত্রী প্রতিষ্ঠিত সিটি স্কুল থেকে তিনি সুনামের সাথে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পাশ করেন।

দেবেন্দ্রমোহন খেলাধুলায় ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। তিনি অল্প বয়সে ‘সপ্তর্ষি ক্লাব’ এবং ‘স্পোর্টিং ইউনিয়ন ক্লাব’ এর জন্ম দেন এবং সেখানে তিনি ক্রিকেট, ফুটবল ও হকি চুটিয়ে খেলতেন। তিনি ছিলেন হকি দলের ক্যাপ্টেন।

মামার ইচ্ছায় তিনি শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে কারিগরি বিদ্যায় শিক্ষা নিতে থাকেন। কিন্তু মারাত্মক শারীরিক অসুস্থতার জন্য মাঝপথে তা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এর কিছুদিন পর তিনি ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে, বিষয়- ভূতত্ত্ববিদ্যা। সেখান থেকে তিনি কৃতিত্বের সাথে বিএসসি পাশ করেন। রবীন্দ্রনাথের পরামর্শে জগদীশচন্দ্র বসু দেবেন্দ্রমোহনকে প্রেসিডেন্সি কলেজে ফিজিকস্ এ ভর্তি করেন।

1906 সালে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ফিজিক্সে এম.এ পাস করেন তিনি। পরের এক বছর প্রফেসার জে সি বোসের অধীনে গবেষণা করেন এবং 1907 সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রাইস্টস্ কলেজে পড়তে যান। এখানে আধুনিক পদার্থবিদ্যার জনকস্বরূপ জে জে টমসনের অধীনে গবেষণা শুরু করেন এবং পরে তিনি ক্লাউডচেম্বার বা মেঘপ্রকোষ্ঠ নিয়েও বিস্তারিত গবেষণা শুরু করেন। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত রয়‍্যাল কলেজ অফ সায়েন্স থেকে বিএসসি অনার্স ডিগ্রি অর্জন করেন এবং দেশে ফিরে এসে তিনি সিটি কলেজে অধ্যাপনার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এরপর সেইসময় যখন স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের প্রচেষ্টায় সায়েন্স কলেজে পদার্থবিদ্যায় এমএসসি ডিগ্রী চালু হয় তখন সেখানে তিনি অত্যন্ত সম্মানীয় পদ ‘স‍্যার রাসবিহারী ঘোষ অধ্যাপক’ হিসাবে যোগদান করেন।

1914 সালে উচ্চতর গবেষণা এবং পড়াশোনার জন্য তিনি বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। সেখানে পদার্থের তেজস্ক্রিয় ধর্মের ওপর গবেষণা করেন। এই সময় তিনি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈজ্ঞানিক আলোচনাসভাগুলিতে যোগদান করতেন। তার ফলে বিশ্বব্যাপী পদার্থবিদ্যার উন্নতি এবং হাল হকিকত সম্বন্ধে জানতে পারেন। জার্মানে থাকার সময় বিখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে এবং তাঁদের মধ্যে আত্মিক যোগাযোগ গড়ে ওঠে। মেঘপ্রকোষ্ঠ নিয়ে তাঁর উল্লেখযোগ্য গবেষণা জার্মানির বিখ্যাত পত্রিকা ‘Zeitschrift & Physix’ তে প্রকাশিত হয়।

1919 সালে তিনি বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর দেশে ফিরে তিনি পুরনো পদেই আসীন হন, 1935 সাল পর্যন্ত তিনি ঐ পদেই ছিলেন। এরপর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যার পালিত অধ্যাপক হন। পরে মামার মৃত্যুর পর 1938 সালে বসুবিজ্ঞান মন্দিরের মহাপরিচালক পদ অলংকার করেন।দেশে ফেরার পর থেকেই তিনি ক্লাউড চেম্বার নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যান, এমনই এক গবেষণাপত্র 1923 সালে বিখ্যাত জার্নাল ‘নেচারে’ প্রকাশিত হয় এবং তা পাঠ করে রাদারফোর্ড অত্যন্ত খুশি হন এবং তাঁকে সপ্রশংস চিঠি দেন। তিনি যে ক্ষেত্রগুলিতে গবেষণা করেছেন সেখানেই নিজস্বতার ছাপ রেখেছেন।

তিনি বিভিন্ন শ্রেণীর রাসায়নিক যৌগ পদার্থের অণুর চৌম্বকধর্ম নিয়ে গবেষণা শুরু করেন এবং বিখ্যাত এক সূত্র ‘ওয়েলো সূত্র’ আবিষ্কার করেন। এরপর 1927 সালে মৌলিক পদার্থের চৌম্বকধর্ম নিয়ে তাঁর বিখ্যাত সূত্র ‘বসু স্টোনার থিয়োরী’ প্রকাশিত হয় এবং সমগ্র বিশ্বে বিজ্ঞানী মহলে তা আলোড়ন তোলে। এরপর তরুণ গবেষিকা বিভা চৌধুরীরকে সাথে নিয়ে তিনি তাঁর বিখ্যাত গবেষণা কসমিক রশ্মির গতিপথ আবিষ্কারে রত হন। সান্দাকফুতে নির্মিত গবেষণাগারে ইমালশন ফটোগ্রাফিক প্লেটে তিনি এক কসমিক কণার ভর নির্ধারণে সফল হন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার কারণে তিনি উন্নত মানের ইমালশন প্লেট পাননি। তাই তাঁর গবেষণা নিখুঁত হয়নি। কিন্তু তিনি পথ দেখালেন।

পরবর্তীকালে বিখ্যাত বিজ্ঞানী পাওয়েল ওই একই বিষয়ে উন্নত ফটোগ্রাফিক প্লেট নিয়ে গবেষণা করে পাই -মেসনের আবিষ্কার করে নোবেল পান। আবারো একজন ভারতীয় বঞ্চিত হলেন নোবেল পুরস্কার থেকে।উদ্ভিদের শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপ এবং তাদের বংশপঞ্জি নিয়ে তিনি গভীরভাবে গবেষণা চালিয়ে যেতে থাকেন, এর ফলে বসু বিজ্ঞান মন্দিরের সুনাম বৃদ্ধি পায়। এই সময় বসু বিজ্ঞান মন্দিরে গবেষণা করতেন প্রখ্যাত প্রকৃতিবিদ গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য, ভারতের অন্যতম বায়োফিজিস্ট মৃগাঙ্কশেখর সিংহ ইত্যাদির মতো মহান ব্যক্তিত্বরা।জীবনে অনেক বড় বড় সম্মানীয় পদ দায়িত্ব সহকারে সামলেছেন। দুবার ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছিলেন, বিশ্বভারতী ও সিটি কলেজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন। মেঘনাথ সাহা প্রতিষ্ঠা ‘সায়েন্স এন্ড কালচার’ পত্রিকার আজীবন উপদেষ্টা ছিলেন, ‘ইন্ডিয়ান সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশনের’ আজীবন সদস্য ছিলেন এবং ‘ইন্ডিয়ান ফিজিক‍্যাল সোসাইটি’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। বিশ্বভারতী থেকে তিনি ‘দেশিকোত্তম’ উপাধি লাভ করেন। তাঁর বিখ্যাত ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ডক্টর সত্যেন্দ্রনাথ বসু, বিভা চৌধুরী ইত্যাদি।

আজীবন নিয়মনিষ্ঠ মানুষটি 1975 সালের 2রা জুন মৃত্যুবরণ করেন। মহাবিজ্ঞানী হিসাবে আমরা দেবেন্দ্রমোহনকে যেন কোনদিন ভুলে না যাই।


উৎপল অধিকারি

এসিস্টেন্ট টিচার, অঝাপুর হাই স্কুল, অঝাপুর, জামালপুর, পূর্ব বর্ধমান