আবেশ দিয়ে রান্নাবান্না

দিনটা ছিল শনিবার। ছুটির দিন। সারাদিন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আমি রবি আর আমার যমজ ভাই সোম হয়ে পড়েছিলাম বেজায় ক্লান্ত। (আসলে ঘুমানোও তো একটা কাজ, তাই ক্লান্তি আসাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।) পরবর্তী কর্মসূচি কী হবে তাই নিয়ে ভাবনা-চিন্তা চলছিল।
সূর্য অস্ত যাওয়ার মুখে হঠাৎ উদয় হল জঙ্গলদা। দেখেটেখে মনে হল আছে বেশ খোশমেজাজেই। কুশল বিনিময়ের পরেই বলল, ‘কাল লাঞ্চ করবি আমার ওখানে। রান্নাবান্নার পুরোটাই করব আবেশ দিয়ে।‘
শুনে আমি ভীষণ ভড়কে গেলাম। বাংলায় বিশেষ জ্ঞানগম্যি না থাকলেও ‘আবেশ’ কথাটার মানে যে সম্মোহন, ঘোর বা আবেগ তা জানতাম। এসব দিয়ে রন্ধনকর্ম কীভাবে নিষ্পন্ন করা সম্ভব, সেটা মগজে আদৌ ঢুকলো না।
আমাকে ভ্যাবাচাকা খেতে দেখে বোধহয় জঙ্গলদার দয়া হল। মুচকি হেসে বলল,’আবেশ মানে ইন্ডাকশন … আরও ভালভাবে জানাতে হলে বলতে হবে, চৌম্বক আবেশ (magnetic induction)। রিসেন্টলি একটা ‘ইন্ডাকশন হিটিং কুকটপ’, চলতি কথায়, ‘ইন্ডাকশন হিটার’ কিনেছি। পুরো রান্নাটাই ওটাতে করব বলে আবেশ দিয়ে রান্নার কথাটা মুখ থেকে বেরিয়েছিল। তুই এমন ঘাবড়ে যাবি বুঝতে পারিনি।‘
আমি স্মার্টনেস দেখিয়ে বললাম,’আমার ওটাই মনে হয়েছিল। এখন তো অনেক বাড়িতেই ব্যবহার হচ্ছে, তাই নামটা আদৌ অপরিচিত নয়। তবে আবেশ বলাতে ধন্ধে পড়েছিলাম।‘
সোম কিছুই বলল না, শুধু খ্যাক খ্যাক করে বিচ্ছিরিভাবে হাসতে লাগল। আমি অবশ্য কোনোদিকে দৃকপাত করলাম না। বয়সে মিনিট পোনেরো ছোটো হলেও কনিষ্ঠ ভ্রাতা তো, দাদা হয়ে ওর ভুল কাজকর্ম ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখাই উচিত।
‘চৌম্বক আবেশ থেকে কীভাবে তাপ উৎপন্ন হয় জঙ্গলদা ?’ প্রশ্নটা আমার। জ্ঞানার্জনের ইচ্ছে সর্বদাই প্রবলভাবে ক্রিয়াশীল আমার মানসপটে।
হিটারের বডি গরম হলেও ইন্ডাকশন কুকটপ কিন্তু বিলকুল গরম হয় না, উত্তপ্ত হয় কেবল বিশেষ ধরনের চৌম্বক উপাদান (magnetic material) দিয়ে তৈরি রন্ধন পাত্রটাই | Image source: piotrgregorczyk.photoshelter.com
জঙ্গলদা বলল, ‘সংক্ষেপে ব্যাপারটা জানাচ্ছি সহজ ভাষায়। ইলেকট্রিক রেজিসট্যান্স থেকে হিটার যেমন গরম হয়, ঠিক তেমনি ম্যাগনেটিক রেজিসট্যান্সকে কাজে লাগিয়ে ইন্ডাকশন কুকটপ কাজ করে। আশ্চর্যের কথা, হিটারের বডি গরম হলেও ইন্ডাকশন কুকটপ কিন্তু বিলকুল গরম হয় না, উত্তপ্ত হয় কেবল বিশেষ ধরনের চৌম্বক উপাদান (magnetic material) দিয়ে তৈরি রন্ধন পাত্রটাই ! লোহা এবং ‘ফেরাইটিক’ গোত্রের স্টেনলেস স্টিলের পাত্র ব্যবহার করা যাবে কিন্তু অ্যালুমিনিয়াম, তামা বা সাধারণ স্টেনলেস স্টিলের পাত্র চলবে না একেবারেই।‘
একটু দম নিয়ে আবার ব্যাখ্যান শুরু করল জঙ্গলদা,’ জেনে অবাক হবি, ইন্ডাকশন কুকটপের ভেতরে একটা তারের কুণ্ডলী ছাড়া আর কিছুই নেই। এই কুণ্ডলীর ভেতর দিয়ে 50 হার্ৎস্ কম্পাঙ্কের প্রত্যাবর্তী প্রবাহের (alternating current) বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলে কুণ্ডলীটি একটি চুম্বকের মত আচরণ করতে শুরু করে। ফলে একদিকে উত্তর মেরু ও অন্যদিকে দক্ষিণ মেরু তৈরি হয়। প্রবাহ প্রত্যাবর্তী হওয়ায় তড়িৎ-চুম্বকের মেরু পালটাতে থাকে সেকেন্ডে 100 বার । চৌম্বক উপাদান নির্মিত রন্ধনপাত্রে আবেশের কারণে তৈরি হওয়া মেরুও অনুরূপে পালটাতে থাকে সেকেন্ডে 100 বার। এতবার পরিবর্তন কারই বা পছন্দ হয়, তাই পাত্রের চৌম্বকীয় রোধের দরুন তৈরি হয় তাপ। তপ্ত পাত্র তাই রান্নার কাজে সাহায্যের হাত দেয় বাড়িয়ে। ইন্ডাকশন কুকটপের উত্তাপ সৃষ্টির পেছনের গপ্পো এটাই !’
হাতঘড়ি দেখল জঙ্গলদা। আজ তাহলে বিদায় নিচ্ছি। কাল এগারোটার মধ্যেই চলে আসিস। একবার চা-চক্রের আসর বসান যাবে তাহলে।
আমরা প্রবলভাবে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালাম। অতঃপর আমাদের আসর ভঙ্গ হল।

সুজিতকুমার নাহা
বিশিষ্ট বিজ্ঞান লেখক।
