Astronomy-জ্যোতির্বিজ্ঞানFree ArticlesPopular Science-জনপ্রিয় বিজ্ঞানScience News-বিজ্ঞানের টুকরো খবর

বিজ্ঞানের টুকরো খবর – ৩: টাইটানের সর্ববৃহৎ গহ্বরটিই কী প্রাণের প্রথম উৎস?

আচ্ছা শনির হিমশীতল উপগ্রহ টাইটানে কি প্রাণের অস্তিত্ব আছে? ঠিক এই প্রশ্নটিই বিজ্ঞানীদের অনেক দিন ধরে ভাবাচ্ছিল। টাইটানের পৃষ্ঠতল জৈব হাইড্রোকার্বোন দিয়ে গঠিত । এর এই উপগ্রহের পৃষ্ঠতলে যে বরফের চাদরটি দেখতে পাওয়া যায়, তা সম্ভবত জল ভর্তি একটি আস্ত সমূদ্রকে ঢেকে রেখেছে। একটি গ্রহাণু (astoroid) বা একটি ধূমকেতু (comet ) হয়ত কোনো এক সময় সজোরে ধাক্কা মেরেছিল টাইটানকে। আর ঠিক তখনই টাইটানের প্রধান দুটি উপকরণ -অর্থাৎ জৈব হাইড্রোকার্বোন ও জল -এই দুটির মিশ্রণ ঘটে যায়। ফলস্বরূপ টাইটানের গহ্বরের মধ্যে তৈরী হয়ে যায় প্রাণসৃষ্টির আদর্শ পরিবেশ।

প্যারিস ইউনিভার্সিটির গ্রহবিদ ও টাইটান বিশেষজ্ঞ লি .বনফয়ের (Lea Bonnefoy) মতে প্রচুর পরিমান জলরাশির উপরিতলে যদি সাময়িকভাবে উষ্ণ জলকুন্ড তৈরী হয়,তবে সেখানে প্রাণ সৃষ্টির একটা আদর্শ পরিবেশ তৈরী হয়। তার ওপর আবার পৃষ্ঠতলের জৈব পদার্থ যদি চক্রাকারে সমুদ্রের জলে মেশে, তবে সমুদ্র আরো বেশি বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।

২০১২ সালে নাসার (NASA) ক্যাসিনি মিশনে (Cassini Mission) বিজ্ঞানীরা টাইটানের পৃষ্ঠতলের মোটামুটি ১০০ কিমি নিচে অবস্থিত সমুদ্রে হালকা জোয়ার ভাঁটা খেলতে দেখেন। ক্যাম্পিয়ান্স ইউনিভার্সিটির গ্রহ ভূবিজ্ঞানী আলভারোপেন্তিয়াডো ক্রসটার (Alvaro Penteado crosta) মতে উপগ্রহটি পৃষ্ঠতলে অবস্থিত গহ্বরর্গুলির প্রভাবে আলোড়িত হয়। তিনি মনে করেন এরকমই কোন বড়ো আলোড়নের প্রভাবে হয়তো টাইটানের পৃষ্ঠতলে ফাটল ধরে এবং পৃষ্ঠতলের জৈব পদার্থ নিম্নবর্তী সমুদ্রের জলরাশির সাথে মিশে যায়। এই আদিম মিশ্রণে (A primordial soup) বা জৈব পদার্থ মিশ্রিত জলে প্রাণসৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ তৈরী হয়।

৪২৫কিমি চওড়া টাইটানের সর্ববৃহৎ গহ্বর মিনার্ভার ওপর আলভারো ও তাঁর সঙ্গীরা পর্যবেক্ষন শুরু করেন । তাঁদের মতে প্রায় ১বিলিয়ন বছর পূর্বে ৩৪ কিলোমিটার চওড়া একটি মহাকাশীয় প্রস্তর খন্ড ৭ কিলোমিটার/সেকেন্ড বেগে সজোরে ধাক্কা মারে টাইটানকে। তখনি মিনার্ভার সৃষ্টি হয়।

এই সংঘর্ষে যে প্রভূত পরিমান তাপ উৎপন্ন হয় ,তার ফলে বরফের চাদর কিছুটা গলে যায় ও উৎপন্ন গহ্বরের মধ্যে একটি জলাধার তৈরী হয়। এই জলাধারটি টাইটানের হিমশীতল পরিবেশে জমে যাবার পূর্বে প্রায় ১ বিলিয়ন বছর অব্দি সজীব ছিল। সুদীর্ঘ এই সময়কালে তরল জল , জৈব পদার্থ ,ও সংঘর্ষের ফলে উৎপন্ন তাপমাত্রার সমন্বয়ে জীবাণুর সৃষ্টির সম্ভাবনা কিন্তু প্রবল। ব্যাকটেরিয়া সৃষ্টির পক্ষে এটি তো একেবারে আদর্শ পরিবেশ।

প্রধানত মিনার্ভার ওপরই গবেষণা করলেও পেন্তিয়াডো ক্রসটা মনে করেন, টাইটানের বরফের চাদরটিকে সরিয়ে ৯০ কিলোমিটার প্রশস্ত ও ৫০০০ কিলোমিটার দূরবর্তী টাইটানের আরেকটি গহ্বর সেল্ক (Selk ) এর ওপর পরীক্ষা চালানো তুলনায় সহজ হবে। সেল্ক মিনার্ভার থেকে বয়সেও নবীন। কয়েকশো মিলিয়ন বছর পূর্বে এর জন্ম। তাই তুলনায় তাজা প্রাণের হদিশ হয়ত এখানে পাওয়া যেতে পারে। হতে পারে ব্যাকটেরিয়ার মত কিছু প্রজাতির ফসিল বরফের স্তরে এখানে সংরক্ষিত আছে।

নাসার ড্রাগনফ্লাই মিশনে সেল্ক টাইটানের পৃষ্ঠের আরেকটি গহ্বর সেল্ক (Selk) -এ একটি ১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের নিউক্লিয়ার পাওয়ার চালিত স্বয়ংক্রিয় ড্রোন অবতরণ করানোর কথা ভাবা হচ্ছে। এটি কে ২০২৭ সালে টাইটানের উদ্দ্যেশ্যে ছাড়া হয়। এটি ২০৩৬ সালে টাইটানে অবতরণ করবে। বরফের চাদরটি কে যদি ভাঙা সম্ভব হয় তবেই এই মিশন টি সফল হবে।

জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটির অ্যাপ্লায়েড ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের বিজ্ঞানী ও ড্রাগনফ্লাই মিশনের প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর এলিজাবেথ টার্টল এই মিশন সম্পর্কে অতটা আশাবাদী নন।
ড্রাগনফ্লাই টাইটানের অন্যান্য গর্তগুলিতেও পরীক্ষা চালাবে। পেন্টিয়াডো ক্রসটা বলেন যদিও মিনার্ভা খুবই দূরবর্তী , তবুও ভবিষ্যতে হয়তো ড্রাগনফ্লাই এখানেও অবতরণ করবে।


অরুন্ধতী চৌধুরী

স্নাতক স্তরে প্রাণীবিদ্যায় অনার্স
স্নাতকোত্তর স্তরে পরিবেশ বিজ্ঞান
ডকুমেন্টারি ফিল্মের জন্য বিভিন্ন শিক্ষামূলক বিষয় সম্পর্কিত স্ক্রিপ্ট লিখেছেন। থিয়েটার মুভমেন্ট থেরাপি নিয়ে কাজ করেন।