পোলিও-র মতোই করোনাও কি নির্মূল হবে এই নতুন ভ্যাক্সিনে

আজ প্রায় পাঁচ মাস হয়ে গেল আমরা COVID-19 সৃষ্টিকারী SARS-COV-2 করোনা ভাইরাসের আক্রমণে তটস্থ, গৃহবন্দি।এখনো ওষুধ কিছু নেই। ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের জন্য তোলপাড় হচ্ছে সারা বিশ্বের সরকারি বেসরিকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণাগার। আমরা জানি, মরা জীবাণু, জ্যান্ত কিন্তু নির্বিষ জীবাণু বা জীবাণুর কোনো প্রোটিনও আমাদের দেহে ভ্যাক্সিন হিসেবে ব্যবহার করা যায়। আমাদের অনাক্রম্যতা ভ্যাক্সিনগুলোকে আসল জীবাণু ভেবে চিনে রাখে, পরে দেহে যদি আসল জীবাণুর আক্রমণ হয়, আমাদের অনাক্রম্যতা সক্রিয় হয়ে সেসব জীবাণুদের মেরে ফেলে। এভাবেই কাজ করে ভ্যাক্সিন। বিভিন্ন রকমের ভ্যাক্সিন বানাবার চেষ্টা করছে, করোনার বিভিন্ন প্রোটিনকে ব্যবহার করে সারা বিশ্বে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে করোনার কাঁটা-প্রোটিনটি।
কিন্তু, অনেকেরই প্রশ্ন, এত ঝুট ঝামেলার মধ্যে না গিয়ে সরাসরি মরা বা নিষ্ক্রিয় করোনা ভাইরাস কেন ব্যবহার করা হচ্ছেনা ভ্যাক্সিন হিসেবে? যেমন, ১৯৫০-র দশকে পোলিও ভাইরাসের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানী জোনাস সলক্ করেছিলেন অ্যামেরিকায়। তখন মরা ভাইরাসও যে ভ্যাক্সিন হিসেবে কাজ করতে পারে, সেরকম কোনো ধারণাই ছিল না! লোকে বিশ্বাসও করছিলনা তাঁকে। সেজন্য ওঁকে অনেক ব্যঙ্গ বিদ্রূপও সহ্য করতে হয়েছে। যিনি জ্যান্ত কিন্তু নির্বিষ পোলিও ভাইরাস দিয়ে ভ্যাক্সিন বানাচ্ছিলেন, সেই আলবার্ট স্যাবিন জোনাসকে ব্যাঙ্গ করে বলেছিলেন, “ও তো রান্নাঘরের কেমিস্ট”! (অর্থাৎ না হলে এসব উদ্ভট তত্ত্ব দিতে পারে!) কিন্তু জোনাস অনড় ছিলেন। কারণ, ওঁর মত ছিল, জ্যান্ত নির্বিষ ভাইরাসের চেয়ে নিষ্ক্রিয় ভাইরাস অনেক বেশি নিরাপদ! কারণ এরা আমাদের দেহে সংখ্যাবৃদ্ধি করতে পারবেনা কোনভাবেই, কিন্তু অর্জিত অনাক্রম্যতা (Acquired immunity) তৈরি করবে ষোল আনা!
তাই কি করেছিলেন জোনাস সলক্? তিনি বাঁদরের বৃক্ক বা কিডনি কোষ কৃত্রিম ভাবে পালন করে, সেগুলোতে পোলিও ভাইরাস সংক্রমণ করেন। পোলিও ভাইরাস ওই কোষগুলোতে সংখ্যাবৃদ্ধি করতে থাকে। এভাবে তিনি কৃত্রিম ভাবে প্রচুর পরিমাণে পোলিও ভাইরাস তৈরি করেছিলেন। তারপর সেই ভাইরাস গুলোকে ফর্মালিন দিয়ে নিষ্ক্রিয় করে ফেলেন। ফর্মালিনের বৈশিষ্ট্য হল, ফর্মালিন কোষ বা ভাইরাসকে মেরে ফেললেও, কোষের বা ভাইরাসের মূল গঠন বিকৃত করেনা। তাই পোলিও ভাইরাস কণার গঠন সেরকমই রইল, খালি তারা নিষ্ক্রিয় হয়ে গেল! এর পর জোনাস সলক্ প্রথমে বাঁদরে সেই নিষ্ক্রিয় ভাইরাস কণা ভ্যাক্সিন হিসেবে প্রয়োগ করে দেখলেন, ওঁর তত্ত্ব নির্ভুল। তারপর নিজের ওপর, স্ত্রী আর তিন সন্তানের ওপরও প্রয়োগ করলেন সেই ভ্যাক্সিন! পরে আরও কিছু শিশুর ওপর। ১৯৫৩ সালে বেতারে ঘোষণা করলেন এই নতুন পদ্ধতির ভ্যাক্সিনের সাফল্য! তৈরি হল ভ্যাক্সিনের নতুন এক অধ্যায়। ধন্য ধন্য পড়ে গেল জোনাসের নামে। কোটিপতি হতে পারতেন জোনাস এই ভ্যাক্সিন পেটেন্ট্ করে। কিন্তু তিনি কোন পেটেন্ট্ নিলেন না, উৎসর্গ করলেন মানবত সভ্যতাকে!
এরপরই শুরু হল অ্যামেরিকার ইতিহাসে বৃহত্তম মানব ট্রায়াল। মাত্র দুমাসের মধ্যে ২০ লক্ষ শিশুকে দেওয়া হল পোলিও ভ্যাক্সিন। বেশ কয়েক বছর পর অবশ্য এসে গেল, স্যাবিনের নির্বিষ কিন্তু জ্যান্ত ভাইরাস “ওরাল ভ্যাক্সিন” (যে পোলিও ভ্যাক্সিন আমাদের দেশে শিশুদের দু ফোঁটা করে এখন খাওয়াতে দেখি আমরা)। ‘রান্নাঘরের কেমিস্ট’ জোনাস সলক আর তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আলবার্ট স্যাবিন দুজনের গবেষণার দৌলতে আজ বিশ্ব পোলিও ভাইরাস মুক্ত হবার পথে!
জোনাস সলক যে পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন, ঠিক সেই পদ্ধতিতে চীনের বিভিন্ন সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান আর সিনোভ্যাক বায়োটেক লিমিটেড মিলে তৈরি করেছে SARS-COV-2 করোনা ভাইরাসের ভ্যাক্সিন। চীন (৫ জন), ইটালি (৩ জন) , সুইত্জারল্যান্ড, ইংল্যান্ড আর স্পেনের (১ জন করে) মোট ১১ জন করোনা আক্রান্তের ফুসফুস থেকে SARS-COV-2 করোনা ভাইরাস সংগ্রহ করা হয়েছে। তারপর এই বিভিন্ন SARS-COV-2 করোনা ভাইরাসগুলোকে সলকের মতই বাঁদরের বৃক্ক বা কিডনি কোষ ব্যবহার করে কৃত্রিম ভাবে করোনা ভাইরাস তৈরি করা হয়েছে। একজন চীনা রোগীর ফুসফুস থেকে পাওয়া ভাইরাসকে চীনা বিজ্ঞানীরা নিষ্ক্রিয় করেছেন ফর্মালিনের বদলে বিটা-প্রোপিওল্যাকটোন নামে একটি রাসায়নিক দিয়ে, যা আজকাল এই নিষ্ক্রিয় ভ্যাক্সিন বানাতে বহুল ব্যবহৃত। এই নিষ্ক্রিয় করোনা ভাইরাস ভ্যাক্সিনের নাম দিয়েছেন তাঁরা ‘PiCoVacc’। আর PiCoVacc কে তাঁরা চ্যালেঞ্জ করছেন বাকি দশটি অন্য রোগীর দেহ থেকে প্রাপ্ত ভাইরাসের ওপর, যাতে বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বেশির ভাগ SARS-COV-2 এর ওপর এর কার্য্যকারিতা পরীক্ষা করা যায়।
PiCoVacc ইঁদুরের দেহে প্রয়োগ করে দেখা গেছে, ইঁদুরের দেহে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে। যদিও এই করোনা ভাইরাস ইঁদুরকে সংক্রামিত করতে পারেনা, তাই প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি কতটা কার্য্যকর তা জানা যায়নি সরাসরি। তবে ইঁদুর থেকে প্রাপ্ত অ্যান্টিবডি বাকি অন্যান্য দশটি আলাদা করে সংগৃহীত SARS-COV-2 কে কৃত্রিম ভাবে কোষে সংক্রমণে বাধা দিচ্ছে, দেখা গেছে। এরপর ওঁরা বাঁদরের ওপর এই ভ্যাক্সিন প্রয়োগ করেন, কারণ বাঁদরে মানুষের মতই SARS-COV-2 এর প্রভাব দেখা যায়। PiCoVacc প্রয়োগের কিছুদিন বাদে ভ্যাক্সিন দেওয়া ও না দেওয়া দু-দল বাঁদরদের মুখ গহ্বর দিয়ে ফুসফুসে SARS-COV-2 করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ঘটালেন তাঁরা। সংক্রমণের সাত দিন বাদে দেখতে পেলেন, PiCoVacc দেওয়া বাঁদরদের দেহে থেকে ৯৫% ভাইরাস নির্মূল হয়ে গেছে, ভাইরাস না দেওয়া বাঁদরদের তুলনায়। ভ্যাক্সিন অনেক সময় ভাইরাস আক্রমণ করলে মাত্রারিতিরিক্ত অনাক্রমত্যা বা immune response তৈরি করে আক্রান্তের ক্ষতি করতে পারে। PiCoVacc দেওয়া বাঁদরদের দেহে সেরকম প্রভাবও এখনো কিছু দেখা যায়নি। তাই চীনা বিজ্ঞানীরা PiCoVacc র সাফল্য নিয়ে খুবই আশাবাদী এবং খুব শিগিগিরিই শুরু হবে এর মানব ট্রায়াল ।
সলকের পোলিও ভ্যাক্সিনের মতো PiCoVacc ও যদি কাজ করে, তবে হয়তো আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আমাদের এই নীল গ্রহ করোনা মুক্ত হবে। যদিও সেই গলার কাঁটা রয়েই যায়, করোনার নিজেকে বদলে ফেলা mutation। চীনা বিজ্ঞানীদের এই কাজটি আজই ৬ মে, ২০২০ বিখ্যাত বিজ্ঞান পত্রিকা ‘science’ এ প্রকাশিত হয়েছে। অপেক্ষা আরও কয়েক মাস এখন এই PiCoVacc র সাফল্য জানতে।

ড. নির্মাল্য দাশগুপ্ত
PhD গবেষক, কোষ ও আণবিক জীববিদ্যা, ক্যালিফোর্ণিয়া, USA | Glenn-AFAR Post Doctoral Fellow at http://www.sbpdiscovery.org/ | Discovery Institute
Former Senior Research Fellow (SRF) at National Institute of Cholera and Enteric Diseases | Studied Biochemistry at University of Calcutta | Studied Biochemistry at Ballygunge Science College | Went to Ariadaha Kalachand High School | Went to Barahanagar Ram Krishna Mission Ashram High School | Lives in San Diego, California | From Kolkata
