Free ArticlesLife Science-জীববিজ্ঞানPopular Science-জনপ্রিয় বিজ্ঞানScience News-বিজ্ঞানের টুকরো খবর

ভ্রমর কথা

bumblebee

“অলির কথা শুনে
বকুল হাসে….”

অলির কথা শুনে বকুল ফুল এখনো হাসে কিনা জানা নেই। কারণ অলিদের কর্ম ব্যস্ততা এখন অনেক বেড়েছে। প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত ও প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার লড়াইটা তো খুব সহজ না। খুব সাম্প্রতিক এক পর্যবেক্ষণে জানা গেছে এক বিশেষ প্রজাতির অলি বা ভ্রমরকুলের (bumblebee) এর এমনই এক টিকে থাকার লড়াই এর কথা।

সম্প্রতি Science journal-এ প্রকাশিত একটা লেখাতে আমার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছিল। Swiss Federal Inst. of Technology Zurich-এ গবেষণারত এক পরিবেশ রসায়ন বিজ্ঞানী (chemical ecologist) কনসুয়েলো ডে মোরেস ও তাঁর কয়েকজন সহকর্মীর বেশ কিছুদিন ধরে নজরে আসছিল একটা অদ্ভুত জিনিস। তা হল এক বিশেষ প্রজাতির কালো ভোমরা (worker bamble bee) আশপাশের ফুল বিহীন গাছগুলোর (ঐ গাছগুলোতে তখনো ফুল আসার সময় হয় নি) পাতায় পাতায় ক্রমাগত ঠুকরে ঠুকরে অসংখ্য ছিদ্র করে চলেছে।

ফুলবিহীন গাছে ক্রমাগত ভ্রমরকুলের এই আচরণ খুবই অস্বাভাবিক ঠেকেছিল। প্রথমে অনুমান করেছিলেন হয়তো বা ভ্রমরের দল ঐ বিশেষ গাছগুলোর পাতার মধ্যের কোন অংশ খাদ্য হিসেবে খাচ্ছে অথবা সংগ্রহ করে তাদের নিকটস্থ বাসস্থানে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। তবে ডি মোরেস একজন পরিবেশ বিজ্ঞানী হিসাবে ঠিক নিশ্চিত হতে পারছিলেন না। ব্যাপারটা তাঁকে ভাবাচ্ছিল।

এই সময়ে তাঁর স্মরণে এলো বছরখানেক আগে, 20th June 2019-এ The Plant Journal-এ প্রকাশিত একটা রিপোর্ট’এর কথা। পাঠকের সুবিধার্থে ওরিজিনাল রিপোর্টটা এখানে তুলে দিলাম।

Unfavourable environmental conditions such as draught can cause plants to flower earlier than normal in order to ensure their reproductive success.

এরকমই আরো একটা রিপোর্ট …Science Journal , June সংখ্যায় প্রকাশিত ..

Insects puncture the plants’ leaves, which cause them to flower, on average 30 days earlier than they otherwise would…

আবার ফিরে আসি ডে মোরেস প্রসঙ্গে। প্রথম রিপোর্ট টা ডে মোরেস কে উদ্দীপ্ত করল অগ্রবর্তী আরো কিছু অনুসন্ধানে।

তিনি একটা পরীক্ষা করলেন। একটা বদ্ধ খাঁচার মধ্যে ফুলবিহীন কয়েকটা টোম্যাটো আর সরষে গাছ রেখে সেই খাঁচায় পুরে দিলেন কয়েকটা কালো ভ্রমর। এভাবে রেখে দিলেন বেশ কিছুদিন পর্যবেক্ষণে। এখানেও দেখতে পেলেন ভ্রমরকুলের সেই একই আচরণ। খাঁচার ভেতরের গাছগুলোর পাতাতেও লক্ষ্য করলেন একই রকমের আক্রমণ। কালো ভ্রমরের দল একই ভাবে তাদের mandibles আর proboscises দিয়ে ঠুকরে চলেছে দুটো গাছেরই পাতাগুলোকে।
এরপর ডে মোরেস ও তার সহকর্মী দল আরো একটা পরীক্ষা করলেন।

খাঁচার বাইরে রক্ষিত ঐ একই রকমের আরও কিছু টোম্যাটো আর সরষে গাছের পাতাগুলোকে তারা নিজেরাই একই রকম ভাবে forceps আর rajor দিয়ে ক্ষত বিক্ষত করলেন। এবার কিছুদিন অপেক্ষার পর যা দেখলেন তা হল….খাঁচার ভেতরের ও বাইরের সব গাছেই ফুল ফুটল নির্দিষ্ট সময়ের অনেকটা আগে .. তবে খাঁচার ভেতরের গাছগুলোতে ফুল ফুটল বাইরের গাছগুলোর থেকেও আরও কয়েক সপ্তাহ আগে। Chemical ecologist ডে মোরেসের অনুমান… পাতা ঠোকরানোর সময় ভ্রমরের মুখ নিঃসৃত লালায় এমন কোন রাসায়নিক আছে যা ফুল ফোটানোর পদ্ধতিকে হয়তো তরান্বিত করেছে।

এর পরের ধাপে ডে মোরেস ও তার সহকর্মী দল আরও এক প্রস্থ পরীক্ষা করলেন। তারা খুব নিবিষ্ট ভাবে লক্ষ্য রাখলেন চিহ্নিত একদল ভ্রমরের ওপর… এদের বাসার কাছাকাছি গাছগুলোতে ফুল না এলেও একটু দূরের গাছগুলোতে ফুল ছিল। তাঁরা দেখতে চাইছিলেন … এ ক্ষেত্রে ভ্রমরের দল ঐ দূরবর্তী গাছগুলোর কাছে গিয়ে মধু সংগ্রহ করে কিনা। আর এক্ষেত্রে দারুণ বিস্ময়ের সঙ্গে যা পর্যবেক্ষণ করলেন তা হল … দূরবর্তী গাছগুলোর ফুলের থেকে মধু সংগ্রহের পাশাপাশি এই ভ্রমরের দল ফুল বিহীন নিকটস্থ গাছগুলোর পাতা ঠোকরানোর কাজও অব্যাহত রেখেছে। তৃতীয় ধাপের এই পর্যবেক্ষণের ব্যাখ্যা বোধ হয় একমাত্র এভাবেই করা যায়….. নিকটবর্তী গাছগুলোতে মধুর ভান্ডার মজুত রাখা…চটজলদি হাতের কাছে সঞ্চয় প্রস্তুত রাখা যা আপত্কালীন প্রয়োজনে ব্যবহার করা যাবে।

কেন বা কিভাবে পতঙ্গের দ্বারা সৃষ্ট আঘাতে গাছের দেহের প্রজনন সিস্টেমে এমন কিছু পরিবর্তন ঘটে যা ফুল ফোটানোর সময়কে তরান্বিত করে, অথবা পাতার ওপর ক্রমাগত আঘাতে আণবিক স্তরে (in molecular level) গাছের দেহের কোন পরিবর্তন হয় কিনা বা হলেও কি সেই পরিবর্তনের স্বরূপ … এসমস্তই এখনও গবেষণার স্তরে। তবে এই বিশেষ প্রজাতির পতঙ্গকূলের এহেন বুদ্ধিদীপ্ত ও সুসংবদ্ধ পরিকল্পিত আচরণের কথা জেনে সত্যিই বিস্ময়ের সীমা থাকেনা। প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত ও প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে এই যে জীবনযুদ্ধে হার না মেনে টিকে থাকার উদ্দেশ্যে নতূন নতুন উপায় খুঁজে বার করা… বিবর্তনীয় অভিযোজনের (evolutionary adaptation) এর এ এক উল্লেখ্যযোগ্য উদাহরণ।

তরহ্যসূত্রঃ

Ref.


ড.  অঞ্জনা ঘোষ

বিজ্ঞান লেখিকা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অজৈব রসায়নে পিএইচডি | বর্তমানে অশোক হল বালিকা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় (সিনিয়র বিভাগ)-এর শিক্ষিকা।

Anjana Ghosh

বিজ্ঞান লেখিকা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অজৈব রসায়নে পিএইচডি | বর্তমানে অশোক হল বালিকা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় (সিনিয়র বিভাগ)-এর শিক্ষিকা।