Free ArticlesLife Science-জীববিজ্ঞানPopular Science-জনপ্রিয় বিজ্ঞান

আমরা কি সত্যিই শিম্পাঞ্জীর বংশধর?

জীববিজ্ঞানের সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব হচ্ছে বিবর্তনবাদ। পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশ বুঝতেই শুধু নয়, প্রাণের বৈশিষ্ট্য, গুণাবলী বুঝতেও বিবর্তনবাদ অপরিহার্য। অথচ এই বিবর্তনবাদ নিয়েই রয়েছে যত ধোঁয়াশা। আজ আমরা জানার চেষ্টা করব মানুষের বিবর্তন কীভা‌বে হয়েছিল।

সত্যিই কি শিম্পাঞ্জী বা বানর থেকে আধুনিক মানুষের সৃষ্টি হয়েছে? নাকি এর পিছনে রয়েছে অন্য কোনো কাহিনী? মানুষের বিবর্তন যদি বানর বা শিম্পাঞ্জী থেকে হয় তাহলে এখনো কেনো বানর বা শিম্পাঞ্জী আছে? কেন-ই বা শিম্পাঞ্জী থেকে নতুন মানুষ সৃষ্টি হচ্ছে না? কেন-ই বা মানুষ থেকে নতুন কোনো প্রজাতির সৃষ্টি হচ্ছে না?

দুটি সজ্ঞাঃ-

অভিযোজন (Adaptation) – কোনো একটি নির্দিষ্ট পরিবেশে বেঁচে থাকা এবং বংশবৃদ্ধি করার জন্য জীব দেহে গঠনগত (Structural), শারীরবৃত্তীয় (Physiological), আচরণগত (Behavioural) স্থায়ী পরিবর্তনকে অভিযোজন বলা হয়। যেমন, বেশকিছু ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের শ্বাসমূল দেখা যায়।

অভিব্যক্তি / বিবর্তন (Evolution) – সহজভাবে বলতে গেলে পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্য নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হওয়া কেই বিবর্তন বলা হয়। যেমন, এককোশী অ্যামিবার থেকে বহুকোশী জীবের সৃষ্টি।

বর্তমানে মানুষের যে প্রজাতিটি টিকে আছে, সেটি হল হোমো সেপিয়েন্স সেপিয়েন্স (Homo sapiens sapiens)। বনমানুষ থেকে প্রায় কুড়ি মিলিয়ন বছরের ধারাবাহিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে আধুনিক মানুষের। মনে করা হয় ড্রায়োপিথেকাস বা ওক এপ (Dryopithecues or Oak-ape) হল বনমানুষদের পূর্বসুরী। এরা গাছে বসবাস করত আবার তৃণভূমিতেও খাদ্য সন্ধান করত। আসুন দেখে নেওয়া যাক বনমানুষ থেকে মানুষের বিবর্তনের পর্যায়গুলি —

Australopithecus (অস্ট্রালোপিথেকাস) — অস্ট্রেলিয়ার একজন নৃবিজ্ঞানী রেমন্ড ডার্ট (Raymond Dart) ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রান্সলের (Transvaal) টুং (Taung) অঞ্চলে একটি করোটির সন্ধান পান । এর নাম দেওয়া হয় Australopithecus africanus (অস্ট্রালোপিথেকাস আফ্রিকানাস) । ল্যাটিন ভাষায় ‘ অস্ট্রালিস ‘ শব্দের অর্থ দক্ষিণ, আর গ্রিক ভাষায় ‘পিথেকাস’ শব্দের অর্থ এপ। সুতরাং ‘অস্ট্রালোপিথেকাস’ -এর অর্থ হল দক্ষিণের এপ। দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম এদের জীবাশ্ম খুঁজে পাওয়া যায় বলেই এরূপ নামকরণ।

বিজ্ঞানীরা অস্ট্রালোপিথেকাসের করোটিতে শিম্পাঞ্জি এবং মানুষ উভয়েরই বেশ কিছু বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় লক্ষ্য করেন।তাঁদের বিবেচনায় অস্ট্রালোপিথেকাস মানুষের গোত্রের (Hominidae) অন্তর্গত , বনমানুষদের সঙ্গে নয় । অর্থাৎ, অস্ট্রালোপিথেকাস হল প্রথম মানুষ। এরা প্রায় আড়াই মিলিয়ন বছর আগেকার জীব। এরা সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারত এবং উচ্চতা ছিল প্রায় ৪-৫ ফুট। এদের মস্তিষ্কের আয়তন ছিল ৪০০-৫০০ ঘনসেন্টিমিটার। পরবর্তীকালে অস্ট্রালোপিথেকাসের আরও প্রজাতির (species) জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। উদাহরণ স্বরূপ – রোবাস্টাস (A. robustus) , সেডিবা (A. sediba) , বোইসেই (A. boisei) , গার্হি (A. garhi) , আফারেনসিস (A. afarensis) ইত্যাদি। বিজ্ঞানীদের ধারণা অস্ট্রালোপিথেকাস আফারেনসিস থেকেই সৃষ্টি হয় হোমো হ্যাবিলিসদের। আর এর অন্যান্য প্রজাতিরা কালক্রমে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

Homo habilis (হোমো হ্যাবিলিস) – এরা ২.২ – ১.৮ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে বসবাস করত। পূর্ব এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় এদের জীবাশ্মের সন্ধান পাওয়া গেছে। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং মানবজীবাশ্মতত্ত্ববিদ লুইস ও মেরি লিকি (Louis and Merit Leaky) হোমো হ্যাবিলিসের জীবাশ্ম আবিষ্কার করেন। ল্যাটিন শব্দ ‘হ্যাবিলিস’-এর অর্থ হলো কুশলী। কুশলী বলার কারণ তারাই প্রথম পাথরের অস্ত্র তৈরি এবং তার ব্যবহার করে। এদের মস্তিষ্কের আয়তন ছিল ৬০০-৭০০ ঘনসেন্টিমিটার।

Homo erectus (হোমো ইরেকটাস) — এরা ১.৩ মিলিয়ন থেকে ৩ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীতে বসবাস করত। ১৮৯১ সালে ডাচ মানবজীবাশ্মতত্ত্ববিদ ইউজিন ডুবোইস (Eugene Dubois) জাভায় এই মানুষের জীবাশ্ম আবিষ্কার করেন। তখন এর নাম দেওয়া হয় Pithecanthropus erectus (পিথেকানথ্রোপাস ইরেক্টাস)। পরবর্তীকালে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় Homo erectus erectus (হোমো ইরেকটাস ইরেকটাস)। জাভাতে খুঁজে পাওয়ায় একে জাভা মানবও বলা হয়।

১৯২৬ সালে কানাডার একজন মানবজীবাশ্মতত্ত্ববিদ ডেভিডসন ব্ল্যাক (Davidson Black) চিনের পিকিং (বর্তমানে বেজিং) শহরের কাছে হোমো ইরেকটাসের জীবাশ্ম খুঁজে পান। প্রথমে এর নাম Sinanthropus pekinensis সাইন্যানথ্রোপাস পিকিনেনসিস) রাখা হলেও পরে তা পরিবর্তন করে Homo erectus pekinensis (হোমো ইরেকটাস (পিকিনেনসিস) রাখা হয়। একে পিকিং মানবও বলা হয়ে থাকে।

প্রসঙ্গত, ‘ইরেকটাস'(ল্যাটিন শব্দ) -এর অর্থ খাঁড়া। এদের মুখমণ্ডল তুলনামূলকভাবে খাঁড়া হওয়ার কারণে এরূপ নামকরণ। হ্যবিলিসদের থেকে এরা ভালো পাথরের অস্ত্র তৈরি করতে পারত এবং আগুনেরও ব্যাবহার জানত। ইরেকটাসরাই প্রথম ভাষার ব্যাবহার শুরু করে। এদের মস্তিষ্কের আয়তন ছিল ৭৭৫-১২০০ ঘনসেন্টিমিটার।

Homo sapiens (হোমো সেপিয়েন্স) — হোমো ইরেকটাসদের থেকেই সৃষ্টি হয় আধুনিক মানুষ বা হোমো সেপিয়েন্সের। ল্যাটিন শব্দ ‘সেপিয়েন্স’ -এর অর্থ হল জ্ঞনবুদ্ধি সম্পন্য। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে অন্যান্য প্রজাতির তুলনায় এই প্রজাতির মানুষদের বুদ্ধিমত্তা বেশি ছিল। হোমো সেপিয়েন্স পর্যায়ে দু – প্রকারের বৈসাদৃশ্যযুক্ত প্রকারভেদ পাওয়া গেছে বিশাল এবং ভারী পেশিযুক্ত নিয়ানডারথাল (Homo sapiens neanderthalensis) এবং রোগা গড়নের ক্রো-ম্যাগনন (Homo sapiens cro-magnonensis)।

প্রথম নিয়ানডারথাল মানুষের জীবাশ্ম উদ্ধার করা হয় ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে । জার্মানির ডুসেলডোর্ফের কাছে নিয়েনডার নামক গিরিখাতে এদের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল বলেই নাম দেওয়া হয় নিয়ানডারথ্যাল। আজ থেকে প্রায় আড়াই লক্ষ বছর আগে পৃথিবীতে এরা আবির্ভূত হয়েছিল । নিয়ানডারথালরা গুহাবাসী ছিল এবং হোমো ইরেকটাসদের তুলনায় ভালো পাথরের অস্ত্র তৈরি করতে পারত। এমনকী মৃতদের কবর দেওয়া ও পারলৌকিক আচার পালন করার রীতিও এদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। এদের মস্তিষ্কের আয়তন ছিল ১৪৫০ ঘনসেন্টিমিটার। মানবজীবাশ্মতত্ত্ববিদদের মতে প্রায় ৪০ হাজার বছর আগেও ইউরোপে ঘুরে বেড়াত, তারপরে নাটকীয়ভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়।

ক্রো-ম্যাগননরা ৩৫ হাজার বছর আগে পৃথিবীতে বসবাস করত। ফ্রান্সের ডর্ডোগনি নামক স্থানের ক্রো-ম্যাগনন পাহাড়ে এদের করোটি পাওয়া গিয়েছিল বলে এরূপ নামকরণ। এরা যথেষ্ট উন্নত ছিল, এমনকী বিজ্ঞানীরা মনে করেন বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে এরা প্রায় আধুনিক মানুষের সমকক্ষ ছিল। এদের মস্তিষ্কের আয়তন ছিল ১৬৫০ ঘনসেন্টিমিটার (আধুনিক মানুষের ১৭০০ ঘনসেন্টিমিটার)। ছোট-বড় জন্তু শিকার করে জীবনযাপন করলেও এরা চাষাবাদ করার কৌশল রপ্ত করেছিল, ছবি আঁকতেও জানত।

সময়ের সাথে সাথে ক্রো-ম্যাগননরা আরও উন্নত হয় এবং এদের থেকেই সৃষ্টি হয় আধুনিক মানুষ, অর্থাৎ আমাদের Homo sapiens sapiens

মানুষের অভিব্যক্তির ইতিহাস অন্যান্য প্রাণীদের অভিব্যক্তির মতো । প্রাণীরাজ্যে সবচেয়ে শেষে হয়েছে মানুষের আবির্ভাব| আমাদের সবচেয়ে নিকটবর্তী আত্মীয় হচ্ছে বনমানুষরা (ape)। মানুষরা শ্রেণি ম্যামেলিয়া (Class – Mammalia), বর্গ প্রাইমেট ( Order – Primate ) এবং উপবর্গ অ্যানথ্রোপয়ডিয়া (Suborder – Anthropoidea) –র অন্তর্ভুক্ত । এই উপবর্গের অধিগোত্র হল হোমিনয়ডিয়া (Superfamily – Hominoidea )। বনমানুষ এবং মানুষ এই হোমিনয়ডিয়া-রই অন্তর্গত। হোমিনয়ডিয়াকে আবার তিনটি গোত্রে (Family ) ভাগ করা হয়েছে । প্রথমটি হচ্ছে হাইলোব্যাটিডি ( Hylobatidae ), যার উদাহরণ হল – গিবন (Gibbon); দ্বিতীয় গোত্রের নাম পংগিডি (Pongidae), যার উদাহরণ হচ্ছে – ওরাং ওটাং (Orang-utan), গোরিলা (Gorilla), শিম্পাঞ্জি (Chimpanzees) এবং তৃতীয় গোত্র হল হোমিনিডি (Hominidae), এর উদাহরণ হলাম আমরা, অর্থাৎ মানুষ।

সুতরাং, একথা বলা যেতেই পারে শিম্পাঞ্জীরা মানুষের পূর্বপুরুষ নয়, তারা আমাদের জ্ঞাতিভাই (Cousin)। আমাদের প্রত্যেকের জন্ম একই পূর্বপুরুষ থেকে। তাদের বলা হত গ্রেট এপ (great apes)। আমাদের শেষ সার্বিক পূর্বপুরুষ হল প্লিওবেটশ ক্যাটালোনি (last common ancestor – Pliobates cataloniae. অর্থাৎ, এই প্রজাতির পরে মানুষ, গিবন এবং শিম্পাঞ্জীদের পূর্বপুরুষরা আলাদা গোত্রে ভাগ হয়ে গিয়েছিল)।

পরিশেষে বলা যায় যে, হোমিনিডি গোত্রের সর্বশেষ প্রাণীটি হল মানুষ। আর সেই কারণেই মানুষের থেকে উন্নত কোনো প্রজাতি এখনও সৃষ্টি হয়নি। এখানে ‘সর্বশেষ’ কথাটি বলা হয়েছে, কারণ বিবর্তনের এক এবং একমাত্র লক্ষ্য হলো পরিবর্তিত পরিবেশে বেঁচে থাকা এবং বংশবিস্তার করা। শিম্পাঞ্জীরা যে ধরনের পরিবেশে বসবাস করে সেই পরিবেশ অনুযায়ী তাদের বিভিন্ন রকম অভিযোজন হয়েছে। আবার আমরা যে ধরনের পরিবেশে বসবাস করি, যে ধরনের খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত, সেই অনুযায়ী আমাদের বিভিন্ন অভিযোজন ঘটেছে। ভবিষ্যৎ-এ মানুষ থেকে নতুন কোনো প্রজাতির সৃষ্টি হবে কিনা, তা নির্ভর করবে সেই সময়ের পরিবর্তিত পরিবেশ এবং পরিস্থিতির ওপর। পরিবেশের সঙ্গে সংগ্রামের জন্য যা প্রয়োজন, বিবর্তনের নিয়মানুসারে তাই হবে, অর্থাৎ যোগ্যতমের উদবর্তন ঘটবে।


শৌভিক দে

বর্তমানে সাংবাদিকতা ও গণ জ্ঞাপন বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্র। বিজ্ঞান জ্ঞাপন অবং ভ্রমণ বিষয়ে আগ্রহী।