বিজ্ঞানের টুকরো খবর – ৪ঃ আলাস্কা দ্বীপপুঞ্জের নীচে লুকিয়ে আছে এক বিশালাকায় আগ্নেয়গিরি
আলাস্কার আলুসিয়ান দ্বীপপুঞ্জের (Aleutian Island) নীচে সম্ভবত লুকিয়ে আছে এখনো পর্যন্ত অনাবিষ্কৃত,অদ্ভুত দর্শন, বিশালাকায় এক আগ্নেয়গিরি।

একটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে যে অতীতে কোনো এক সময় আলুসিয়ান দ্বীপপুঞ্জের এই বিশাল আগ্নেয়গিরিটির বিস্ফোরণের সময় একটি প্রশস্ত জ্বালামুখ তৈরী হয়। এবং এই জ্বালামুখটির সাথে কমপক্ষে ৪ টি আরও আগ্নেয়গিরির সংযোগ আছে। এই জ্বালামুখটি এতটাই বড় যে, যদি কয়েক বিগত কয়েক হাজার বছরের মধ্যে যদি আগ্নেয়গিরিটি বিস্ফোরণ ঘটাত তাহলে পৃথিবীর সমস্ত সভ্যতা একসাথে ধ্বংস হয়ে যেত। ৭ই ডিসেম্বর ,২০২০, আমেরিকার জিওফিজিক্যাল ইউনিয়নের এক বার্ষিক সম্মেলনে ইউ,এস, জিও ফিজিক্যাল সার্ভের (U.S Geophysical Survey) অন্তর্গত আলাস্কা ভল্কানো অবসারভেটরির (Alaska Volcano Observatory) জিও ফিজিষ্ট (Geo Physicist) জন পাওয়ার (John power) এই রিপোর্টটি দেন।
ওয়াশিংটন ডিসির, কার্নেগি ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্সের (Carnegie Institute For Science) আগ্নেয়গিরি বিশেষজ্ঞ ডায়না রোমান (Diana Roman) মনে করেন বিক্ষিপ্ত ভাবে প্রাপ্ত কিছু তথ্যের ভিত্তিতেই এই গবেষণাটি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। দ্বীপপুঞ্জের কেন্দ্রস্থলে যে ৬ টি আগ্নেয়গিরি অবস্থিত, সেগুলিকে আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ আগ্নেয়গিরির গুচ্ছ বলেই মনে হয়।

কিন্তু একটু ভালো ভাবে নিরীক্ষণ করলেই ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ক্যালডেরা (Caldera) অর্থাৎ আগ্নেয়গিরির ফাটল দেখা যায়। কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ৬ টি আগ্নেয়গিরির শীর্ষগুলি বৃত্তাকারে সজ্জিত। ১৯৫০ সালে এই অঞ্চলে সমুদ্রের তলদেশের গভীরতা মাপার জন্য যখন ব্যাথিমেট্রিক ম্যাপিং (Bathymetric Mapping ) করা হয় তখন কিছু ধনুকাকৃতি খাঁজ ও ১৩০ মিটার গভীর একটি গহ্বরের সন্ধান পাওয়া গেছিল বৃত্তটির কেন্দ্রস্থলে ।এই সূত্র দুটি থেকে সহজেই অনুমান করা যায় আগ্নেয়গিরিগুলি একটি সুদীর্ঘ ক্যালডেরা দ্বারা সংযুক্ত । তাছাড়া এই আগ্নেয়গিরিগুলির মধ্যে যখন প্রচন্ড বিস্ফোরণ হয়েছিল তখন অভ্যন্তরস্থ লাভারাশি দ্রুত গতিতে বেরিয়ে নিঃশেষিত হওয়ার সময়ই এই জ্বালামূখটির সৃষ্টি হয়েছিল।

স্যাটেলাইট চিত্রের মাধ্যমে আরো ক্যালডেরার সন্ধান পাওয়া যায়। আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের সময় নির্গত বিভিন্ন গ্যাস যেমন সালফার ডাই অক্সাইড, কম তীব্রতার ভূমিকম্পের ধরণ ইত্যাদিও ক্যালডেরার উপস্থিতি প্রমান করে।
রোমান বলেন আলুসিয়ান দ্রবীপপুঞ্জের (Aleutians) অন্যতম সক্রিয় আগ্নেয়গিরি মাউন্ট ক্লিভল্যান্ডের সংলগ্ন অঞ্চলে কম তীব্রতার ভূমিকম্প সমানে হতেই থাকে। এই ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চলগুলি যে শুধুমাত্র আগ্নেয়গিরির তলেই হয় তা নয়। পূর্ব ও উত্তর দিকেও এই ভূমিকম্প ক্ষেত্রটি বিস্তৃত থাকে। এটি ক্যালডেরা প্রসঙ্গটিকে আরো সুনিদৃষ্ট করে।

অগ্নুৎপাতের বহুদিন পরেও সক্রিয় আগ্নেয়গিরির গায়ে ক্যালডেরার ছাপ থেকে যায়। উদাহরণ হিসাবে মাউন্ট ক্লিভল্যান্ডের নাম উল্লেখ করা যায়। ২০০১ সাল থেকে প্রায় ৬০-৭০ বার এর বিস্ফোরণ হয়েছে। বিস্ফোরণের ফলে ছাই আর কালো ধোঁয়ায় সারা আকাশ ঢেকে গিয়ে প্লেন চলাচলে অব্দি বাধা সৃষ্টি করেছিলো। আরেকটি আগ্নেয়গিরি হল ইন্দোনেশিয়ার রিনজানি (Rinjani) । মনে করা হয় ১২৫৭ সাল নাগাদ এই আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণে যে বিশাল পরিমাণ সালফার কনা জমা হয়ে ছিল তার প্রভাবে পুরো পৃথিবী শীতল হয়ে গিয়েছিলো।
বিশালকায় আগ্নেয়গিরির ক্যালডেরা সম্পর্কে যে সমস্ত প্রমাণ পাওয়া গেছে সেগুলির রহস্যভেদ বা সে গুলি কে এক সূত্রে গাঁথা সম্ভব হয়নি। ইয়েলো স্টোন ভলকানো অবজারভেটরির (Yellow Stone Observatory)আগ্নেয়গিরি বিশারদ মিশেল পোল্যান্ড (Michael Poland )এর মতে এই সব তথ্য গুলি একটি ডাটাবেস (Data Base)-এর কাজ করবে যার মাধ্যমে পরবর্তী কালে ক্যালডেরা বিষয়ক গবেষণা সহজসাধ্য হবে।
পোল্যান্ড বলেন , অগ্নুৎপাত প্রবণ আলুসিয়ান সাইটটিতে বছরের খুব অল্প সময়েই গবেষণা চালানোর অনুকূল পরিবেশ থাকে। তাই তথ্য সংগ্রহের জন্য এই সময়ে বিজ্ঞানী দের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। ক্যালডেরা সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ ও সেই নিয়ে পরীক্ষা করাই বিজ্ঞানীদের প্রধাণ উদ্যেশ্য। যেমন, ঠিক কোন সময় বিশালাকার আগ্নেয়গিরিটির বিস্ফোরণ হয়ে ছিল তা তাঁরা নির্ণয় করার চেষ্টা করেছেন পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তে অবস্থিত আগ্নেয়গিরিগুলির বরফের স্তরে চাপা পড়া ভষ্মের সাথে তুলনা করে। পাওয়ার বলেন এই বিশালাকৃতি ক্যালডেরা গুলির সারা বিশ্ব জুড়ে এক অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে।
বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা ও তথ্য সূত্রের মাধ্যমে আমরা জানতে পারবো আগ্নেয়গিরি ক্লিভল্যান্ড এতো সক্রিয় কেন বা তার এই অতি সক্রিয়তার ফলে কি কি ধরণের বিপদের আশংকা আছে।

অরুন্ধতী চৌধুরী
স্নাতক স্তরে প্রাণীবিদ্যায় অনার্স
স্নাতকোত্তর স্তরে পরিবেশ বিজ্ঞান
ডকুমেন্টারি ফিল্মের জন্য বিভিন্ন শিক্ষামূলক বিষয় সম্পর্কিত স্ক্রিপ্ট লিখেছেন। থিয়েটার মুভমেন্ট থেরাপি নিয়ে কাজ করেন।
