বিজ্ঞানের টুকরো খবর ৫ – বায়ুদূষণের ফলে দাবানল থেকেও সৃষ্টি হতে পারে বিদ্যুতের ঝলকানি

অনেকেই জানেন যে, বিদ্যুতের স্ফূলিঙ্গ থেকে অরণ্যে দাবানল সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু জানেন কি, দাবানল থেকেও অনেকসময় সৃষ্টি হতে পারে বিদ্যুতের ঝলকানি! হ্যাঁ ঠিকই, বহু দশক ধরে এই ঘটনাই বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করে চলেছে। বর্তমানে গবেষণার ফলে বিজ্ঞানীরা এর কারণ হিসেবে বায়ুদূষণকে দায়ি করেছেন। বায়ু যত বেশি দূষিত, তত বেশি দাবানল থেকে বিদ্যুৎ-স্ফূলিঙ্গ সৃষ্টি হতে পারে, এমনকি তত বেশি পরিমাণে বৃষ্টিও হতে পারে।
প্রত্যক্ষ গবেষণায় যুক্ত না হয়েও সিয়াটেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ-বিজ্ঞানী জোয়েল থর্নটন দেখিয়েছেন, কীভাবে বায়ুদূষণ আমাদের পরিবেশের উপর প্রভাব ফেলে এবং একই প্রভাব পড়ে ঝড়-বৃষ্টির উপরেও।
দাবানলের সময় বিদ্যুৎ-স্ফূলিঙ্গ তৈরি হওয়ার কারণ বলতে গেলে নানা মুনির নানা মত। বিজ্ঞানীরা বায়ুস্রোত থেকে শুরু করে নগরায়ণ সবকিছুকেই এর কারণ হিসেবে দায়ি করে বসেছেন। কোনো ভূমিরূপের উপরিস্তরের বায়ুর থেকে এই সব উপাদানগুলি কখনোই সেভাবে বিচ্ছিন্ন করা যায় না কারণ বিশাল ভূ-সংস্থান, পরিবর্তিত ভূমির ব্যবহার এবং পরিবর্তিত তাপ – সব মিলিয়ে এমন জটিল এক চলের সমাহার যে তা সহজে বিচ্ছিন্ন করা অসম্ভব।
অস্ট্রেলিয়ার ২০১৯-২০ সালের বিধ্বংসী দাবানলের প্রসঙ্গে আসা যাক যা ‘ব্ল্যাক সামার’ নামে পরিচিত। এই দাবানলের মারাত্মক উত্তাপ প্রায় এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার বর্গ কিলোমিটার জমি পুড়িয়ে দিয়েছিল এবং প্রচুর পরিমাণ ধোঁয়ায় তাসমান সাগর পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাংশ পুরো ছেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সাগরের বিস্তীর্ণ শীতল উপরিতল দাবানলের ভয়াবহতাকে নিরপেক্ষভাবে বিচার করতে সাহায্য করেছে।
ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজির একজন আবহাওয়াবিদ ইয়াকুন লিউ (Yakun Liu) এবং তাঁর সহকর্মীরা উপগ্রহের তথ্য এবং ভূমি-সাপেক্ষ বিদ্যুৎ নির্দেশক ব্যবস্থার সাহায্যে বাতাসের এরোসল এবং ব্ল্যাক সামারের ফলে সৃষ্ট ক্ষুদ্রাকায় বাতাসজাত উপাদানের চলন পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং ঐ এলাকায় বিদ্যুৎ-স্ফূলিঙ্গের বিষয়টি পরিমাপ করেছেন। দাবানলের সময়, মহাসাগরের এক বিরাট অংশের উপরিস্তরের বায়ু ব্যতিক্রমীভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে এবং এর ফলে একটা অগ্যুৎপাতও হতে পারে বলে জানাচ্ছেন লিউ।
সমুদ্রের উপরের বাতাসে দূষণ-সৃষ্টিকারী এমন দাবানলের প্রভাবে, দেখা গেছে, বিগত বছরের একই সময়পর্বের তুলনায় ঐ বছর বিদ্যুৎ ও বজ্রপাতের পরিমাণ প্রায় ২৭০% বেড়ে গেছে। গবেষকরা এই বছর ‘জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটারস’ পত্রিকায় জানিয়েছেন, এই পরিমাণের ভিত্তিতে দেখা গেছে পূর্বের ১২টি বিদ্যুৎ-ঝলকানি বেড়ে গিয়েছে ৪৩টিতে এবং প্রতি বছর প্রতি বর্গ কিলোমিটারের হিসেবে বিদ্যুৎ-স্ফূলিঙ্গের অংশগুলিও বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রত্যক্ষভাবে এই গবেষণায় জড়িত না হলেও, মেক্সিকো শহরের মেক্সিকো ন্যাশনাল অটোনমাস বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ-বিজ্ঞানী গ্রাসিয়েলা রাগা বলছেন, এমন ফলাফল তাঁর কল্পনাতেও আসেনি কখনো।
বজ্রগর্ভ মেঘের মধ্যে ঊর্ধ্বমুখী বরফের কেলাসগুলির সঙ্গে নিম্নগামী শিলার সংঘাত ঘটে এবং এই সংঘাতের ফলেই একটি তড়িৎ আধান সৃষ্টি হয় যা বিদ্যুৎ-স্ফূলিঙ্গের রূপ নেয়। লিউ এবং তাঁর সহকর্মীরা চিহ্নিত করেছেন তাসমান সাগরের উপরের বায়ুমণ্ডলে এরোসল দ্বারা দূষিত মেঘের মধ্যে অধিক ঘনত্বযুক্ত ক্ষুদ্রাকায় বরফ-কেলাস রয়েছে। তাঁদের বিশ্বাস সমুদ্রের উপর এরোসলের বিরাট অন্তঃপ্রবাহ বরফ-কেলাস তৈরির জন্য আরো বেশি স্থান সৃষ্টি করছে।
গবেষকরা আরো লক্ষ করেছেন যে, বিদ্যুৎপাত বৃদ্ধির থেকেও আরো বেশি প্রভাব ফেলেছে বায়ুদূষণ, দাবানলের ধোঁয়া বজ্রপাতের পরিমাণ প্রায় তিনগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তাসমান সাগরের উপরে বজ্র-বিদ্যুৎ সহ বৃষ্টির পরিমাণ প্রায় ২৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে (১২.২ – ৪১.৮ মিমি. প্রতিদিন)।
এম.আই.টি-র একজন আবহাওয়াবিদ এবং এই গবেষণার একজন সহায়ক আর্ল উইলিয়ামস বলছেন এখানে দুটি বিবদমান প্রতিক্রিয়া রয়েছে – বিদ্যুৎ-স্ফূলিঙ্গ থেকে দাবানল তৈরি হয় এবং দাবানল আবার বিদ্যুৎ-স্ফূলিঙ্গ তৈরি করে, যেখানে বৃষ্টিপাতের ফলে পরিবেশ অনেক পরিস্কার হয় যা দাবানল প্রতিরোধ করতে সক্ষম।
থর্নটন জানাচ্ছেন এই ঘটনাটা শুধুই দাবানলের মধ্যে আটকে থাকেনি। তিনি বলছেন, এই ঘটনা দেখায় কীভাবে মানুষ তার নগরায়ণ, যান চলাচল এবং শিল্প-কারখানার কর্মপ্রণালীর সাহায্যে আবহাওয়ার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। ঐ উপাদানগুলির আকার সম্পর্কে যদি কেউ ভাবে, ঝড়-বৃষ্টির উপর সেই উপাদানগুলি যে কী মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে তা তাকে বিস্মিত করবে।

অরুন্ধতী চৌধুরী
স্নাতক স্তরে প্রাণীবিদ্যায় অনার্স
স্নাতকোত্তর স্তরে পরিবেশ বিজ্ঞান
ডকুমেন্টারি ফিল্মের জন্য বিভিন্ন শিক্ষামূলক বিষয় সম্পর্কিত স্ক্রিপ্ট লিখেছেন। থিয়েটার মুভমেন্ট থেরাপি নিয়ে কাজ করেন।
